১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত, এই বিদ্যাপীঠ প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তবে শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৬ বছরে পা রাখা এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের বিপরীতে গবেষণার দৈন্যদশা ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জোরালোভাবে। বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ যখন নতুন করে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বরাদ্দের চিত্রটি রীতিমতো হতাশাজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গবেষণার জন্য নামমাত্র বরাদ্দ এবং ইউজিসির কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুদানে গবেষণার জন্য পৃথক খাতের অভাব বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই বরাদ্দ সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের সমান। যদিও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্কোপাস-ইনডেক্সড জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো করছে, তবুও বৈশ্বিক তালিকায় ৫৮৪তম অবস্থান প্রমাণ করে যে, কেবল ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত উক্তি—বিশ্ববিদ্যালয় যেন ‘বিলেতের আমদানি টবের গাছ’—আজও যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিমা ধারার স্থবির জ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে এটি জ্ঞান সৃষ্টির কারখানার চেয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতিকেন্দ্রে বেশি পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেধা ও সৃজনশীলতা চর্চার চেয়ে বিসিএস বা সরকারি চাকরির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বাধ্য হচ্ছে। পড়াশোনার মান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হাহাকার, তা মূলত সামাজিক কাঠামোরই প্রতিফলন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিবেশের কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয় হলেও, পঠনপাঠনের মান এবং চাকরির বাজারের ওপর অত্যধিক নির্ভরতায় বিশেষ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। শিক্ষার্থীরা এখনো প্রথাগত ছাত্ররাজনীতি ও চাকরির প্রতিযোগিতার চক্রে আটকা পড়ে মেধা ও তারুণ্যের অপচয় করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে পেশিশক্তি, লবিং ও ক্ষমতার রাজনীতির যে প্রভাব, তা জ্ঞানচর্চার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হতে হয়, তবে কেবল অবকাঠামোগত সংস্কার নয়, প্রয়োজন জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্জাগরণ। দেশের মাটি ও মানুষের প্রয়োজনে, বিশ্বমানের গবেষণা ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে গড়ে তোলার এখনই সময়।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
