তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি চিনের সহায়তার কারণ ব্যাখ্যা করেছে বেজিং। একইসঙ্গে, এই প্রকল্প ঘিরে প্রতিবেশী ভারতের উদ্বেগের বিষয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে চিনের বিদেশ মন্ত্রক। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে, যেখানে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের জটিল সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলধারা। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ কার্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা কৃষকদের জীবন-জীবিকাকে গভীর সংকটে ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও, আজ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমাধান সূত্র মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে, জল ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং নদীর উপর নির্ভরশীল মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ বিকল্প সহায়তা খুঁজছিল, যা চিনকে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।
জানা যায়, প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় চিন বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই মহাপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদী তীরবর্তী এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এটি চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি করা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার করা।
তিস্তা প্রকল্পে চিনের এই সরাসরি অংশগ্রহণ ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়াদিল্লি বরাবরই তার প্রতিবেশী দেশগুলিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সন্দেহের চোখে দেখে। ভারতের আশঙ্কা, এই প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি ভারতের নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত হুমকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন’স নেক’ এর মতো সংবেদনশীল এলাকার কাছাকাছি চিনের উপস্থিতি। এছাড়াও, উজানের দেশ হিসেবে ভারতের নিজস্ব তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা রয়েছে, যা চিনের প্রকল্পের কারণে প্রভাবিত হতে পারে বলে নয়াদিল্লি মনে করে।
চিনের বিদেশ মন্ত্রক অবশ্য এই উদ্বেগকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে। বেজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিস্তা প্রকল্পে তাদের সহায়তা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে। চিন এটিকে একটি ‘উইন-উইন’ সহযোগিতা হিসেবে দেখছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক শর্ত বা সামরিক উদ্দেশ্য জড়িত নেই। তাদের মতে, এটি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়, বরং এটি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে যে, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখে। তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে চায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে চায়। এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চিনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ঢাকার জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ, যেখানে উন্নয়নমূলক সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক প্রতিচ্ছবি। চিনের সহায়তা এবং ভারতের উদ্বেগ – উভয়ই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা অপরিহার্য, যা সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
