ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে শেখ পরিবারের নামে প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে, নাম পরিবর্তন না হওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পাঁচ সদস্য সভা বর্জন (ওয়াকআউট) করেন। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ছাত্র রাজনীতির মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সিনেট সভার চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রাসেল টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার এবং সুলতানা কামাল হোস্টেল – এই পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সিনেট সদস্যদের মতামত আহ্বান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম রাখার দাবি জানিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীদের একটি অংশ, যার প্রতিফলন ঘটে ডাকসু প্রতিনিধিদের এই অবস্থানে। তাদের যুক্তি ছিল, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের নামে স্থাপনাগুলো থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বঞ্চনা ও বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।
সিনেট অধিবেশনে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি উত্থাপিত হওয়ার পর এর পদ্ধতিগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সিনেট সদস্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান। তিনি জানতে চান, এই সিদ্ধান্তটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে কিনা। উপাচার্য জানান যে, এটি সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। অধ্যাপক লুৎফর রহমান তখন সিনেটের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সিনেটে আসার আগে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের আবশ্যকতা তুলে ধরেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করে।
তবে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ এই নিয়মকে উপেক্ষা করে সেদিনই সিনেট অধিবেশন থেকে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান। এস এম ফরহাদ তার বক্তব্যে বলেন, ক্যাম্পাসে এখনও ‘ফ্যাসিবাদী আইকন’ গুলো থাকায় সেই হলগুলোর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। তিনি একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। ভিপি আবু সাদিক কায়েম আরও নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি জানান, শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে গেলে শুধুমাত্র নামের কারণে পুলিশি বাধার সম্মুখীন হন। এমনকি ডিবেট ক্লাবেও এই নামের কারণে অনেকে তহবিল দিতে অস্বীকৃতি জানালে কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের ‘ভুক্তভোগী’ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সিনেট সদস্যদের জানান যে, বিষয়টি সিন্ডিকেটে নিয়ে নিয়ম মোতাবেক পরিবর্তন করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। উপাচার্যের এই জবাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে ডাকসু থেকে মনোনীত পাঁচ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াকআউট করেন। ওয়াকআউট করা সদস্যরা হলেন— ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহা. মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ এবং কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছাত্র প্রতিনিধিদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
