আজ ২৫শে জুলাই, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ৮৭ বছর পূর্ণ করে ৮৮তম বর্ষে পদার্পণ করেছেন। ১৯৩৯ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি তাঁর সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনে বাঙালি সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক অবিরাম সাধনা করে চলেছেন। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন মহলে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন তিনি।
অধ্যাপক সায়ীদ কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা বক্তা হিসেবেই পরিচিত নন, বরং তিনি ‘আলোকিত মানুষ’ গড়ার এক বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রাণপুরুষ। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন, এগুলোর সবই সত্য, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে সত্য নয়। তাঁর জীবন দর্শন এবং কর্মপন্থা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে তাঁর পিতা আজিমউদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ দ্বারা। তাঁর পিতা ইংরেজি ও বাংলায় এমএ ডিগ্রিধারী এবং গণিতে অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন, যিনি এক অন্ধকার গ্রাম থেকে উঠে এসে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিলেন। পিতার প্রতি ছাত্রদের অপরিসীম শ্রদ্ধা দেখে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শিক্ষকতা পেশায় আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, তাঁর ভাষায়, ‘মনে হতো যেন দেবতাসম কাউকে নিয়ে কথা বলছে।’ এই প্রভাবই তাঁকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও মূল্যবোধ জাগ্রত করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।
‘শিক্ষকদের সম্মান আগের মতো নেই’ এমন প্রচলিত ধারণাকে তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, সম্মানযোগ্য ব্যক্তির সম্মান কখনোই বিলীন হয় না; যদি কারো সম্মান না থাকে, তবে তার কারণ সম্ভবত তার নিজের কর্মের মধ্যেই নিহিত। এই চিন্তাধারাই তাঁকে শিক্ষকের আদর্শ ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যখন অনেকেই ভেবেছিলেন যে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সোনার বাংলা’ হয়ে যাবে, তখন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে, সোনার বাংলা মানে সোনার রাস্তা বা দালান নয়, বরং ‘সোনার মানুষ’ বা ‘আলোকিত মানুষ’। এই দর্শন থেকেই ১৯৭৮ সালে মাত্র ১০ জন ছাত্র নিয়ে ৩৫ টাকা চাঁদায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়, যার প্রথম পদক্ষেপ ছিল জসীমউদ্দীন-এর ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এর দশটি কপি কিনে পাঠচক্রের আয়োজন। এর উদ্দেশ্য ছিল বইটিকে গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা এবং লেখকের ভাবনাকে অনুধাবন করা।
আজ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আড়াই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে বই পাঠের মাধ্যমে আলোকিত জীবন গঠনের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলাফল হিসেবে লাখ লাখ তরুণ দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখছে, যা অধ্যাপক সায়ীদের কাছে এক বিশাল প্রাপ্তি। তাঁর দীর্ঘ জীবন কামনা প্রসঙ্গে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপহার হিসেবে গণ্য করেন এবং এ পৃথিবীকে বিস্ময়কর ও আনন্দময় বলে বর্ণনা করেন। যারা জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে অভিযোগ করে, তাদের তিনি তিরস্কার করেন, কারণ তাঁর মতে, মানুষের জন্মই এক মহৎ উপহার।
যদিও অধ্যাপক সায়ীদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই বেশি পরিচিত, তাঁর অন্তরে সব সময় একজন লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অতৃপ্তি কাজ করে। গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আত্মকথা, ভ্রমণকাহিনিসহ বহু বিষয়ে তাঁর বিশাল রচনাসমগ্র রয়েছে। বাংলাদেশে একই ব্যক্তি বহু কাজে যুক্ত থাকলে তার পরিচয় নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়, আর এ কারণেই সংগঠক হিসেবে তাঁর পরিচয়টি প্রায়শই লেখক সত্তাকে ছাপিয়ে যায়। তবে তিনি আজও একজন বেদনাতুর লেখক হিসেবে নিরন্তর লিখে চলেছেন, তাঁর লেখক হৃদয় নবীন প্রেমিকের মতোই ভীরু, কম্পমান কিন্তু পৃথিবী জয়ের প্রতিজ্ঞায় সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যগত কিছু জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি বর্তমানে সুস্থতার পথে রয়েছেন।
ষাটের দশকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কণ্ঠস্বর’ নামের সাহিত্য পত্রিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর মতো কবি ও সাহিত্যিকরা এই ‘কণ্ঠস্বর’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে কাব্যিক ও সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন। শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমান উইলিস টাওয়ার)-এর স্থপতি ফজলুর রহমান খানের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘একজন প্রযুক্তিবিদের নিজের প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয় একেবারেই। তাঁকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে জানতে হবে। আর জীবন হলো শিল্প, নাটক, সংগীত আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জীবন হলো মানুষ।’ এই উক্তিটি অধ্যাপক সায়ীদের জীবন দর্শনের সাথে মিলে যায়, যেখানে তিনি সকলকে নিজ নিজ পেশায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার তাগিদ দেন। তাঁর মতে, এই ভালো মানুষ গড়ার লক্ষ্যেই বই, কবিতা, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিরন্তর প্রয়াস। তাঁর আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন আরও বহু প্রজন্মকে আলোকিত করুক, এই কামনাতেই এই প্রজ্ঞাবান শিক্ষকের জন্মদিনে সকলের শুভকামনা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
