নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার এখনো ঢের বাকি থাকলেও মাগুরা জেলাজুড়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শুভেচ্ছা ও প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড, ব্যানার এবং বিলবোর্ডের পাহাড় জমেছে। সরকারি স্থাপনা, আদালতের মূল ফটক, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের প্রাচীর, পৌর ভবন, এমনকি মহাসড়কের সড়কবাতির খুঁটি ও ট্রাফিক আইল্যান্ডেও ঝুলছে এসব প্রচারণা সামগ্রী। এতে একদিকে যেমন শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ পথচারী ও চালকদের চলাচলে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মূল ফটকে কর্তৃপক্ষের সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে যে, সেখানে কোনো ধরনের পোস্টার বা ফেস্টুন লাগানো সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু বাস্তবে সেই নিষেধের তোয়াক্কা না করে আদালতের ফটক ও আশপাশের দেওয়ালে ঝুলছে অন্তত পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন সাইনবোর্ড। এসব বোর্ডে নববর্ষ বা ঈদের শুভেচ্ছার পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দোয়া ও সমর্থন চাওয়া হয়েছে। ফলে আদালতের লিগ্যাল এইড কমিটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবহুল বিলবোর্ডগুলো সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে। শুধু আদালত চত্বর নয়, পারনান্দুয়ালী বাস টার্মিনাল থেকে পুলিশ লাইনস, ভায়না মোড় থেকে নোমানী ময়দান এবং ঢাকা রোড থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে সরেজমিনে অন্তত সাড়ে চার শ ছোট-বড় সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড দেখা গেছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যেমন চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় একই স্থানে ১৭টি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের সাইনবোর্ড ও ব্যানার চোখে পড়ে। এমনকি পৌরসভার তথ্য বোর্ডের জন্য নির্ধারিত স্থান এবং সীমানাপ্রাচীরও বাদ যায়নি এই প্রচারণার দৌরাত্ম্য থেকে। সম্প্রতি চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিলবোর্ড খুলে নেওয়ার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) হয়েছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।
শহরের সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই যত্রতত্র পোস্টার-ব্যানার লাগানোর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কাউন্সিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গাছের ডালপালা ও গুঁড়িতে পেরেক ঠুকে যেখানে-সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা পরিবেশ ও শহরের সৌন্দর্যের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। অনেক জায়গায় এগুলো এতটাই নিচুতে ঝোলানো হয়েছে যে পথচারী ও রিকশা-ভ্যান চালকদের চলাচলের সময় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় শীর্ষ নেতারাও এই পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহম্মেদ গণমাধ্যমকে জানান, দলের কিছু সক্রিয় নেতার পাশাপাশি যাঁদের দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা নেই, তারাও হঠাৎ করে শহরজুড়ে ব্যানার টানিয়ে পরিবেশ নষ্ট করছেন। এটি দলের জন্য বিব্রতকর এবং ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির সাঈদ আহমদ ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, যেহেতু এখনো নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো তফসিল ঘোষণা করা হয়নি, তাই আইনগতভাবে প্রচারণায় কোনো বাধা থাকার কথা নয়। তবে প্রশাসন থেকে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসে, তবে তা তাঁরা অবশ্যই মেনে চলবেন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ স্পষ্ট করেছেন যে, নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি কেবল তফসিল ঘোষণার পরই কার্যকর হয়। এর আগের সময়টায় ব্যানার-পোস্টার নিয়ন্ত্রণ করা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাজের মধ্যে পড়ে না; বরং এটি স্থানীয় পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের আইনি এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
আইনগত দিক থেকে ‘দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো স্থানে যত্রতত্র পোস্টার বা দেয়াললিখন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। মাগুরা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুল কাদের জানিয়েছেন যে বিষয়টি ইতিমধ্যে তাঁর নজরে এসেছে। যাঁরা অনুমতি ছাড়া সরকারি স্থাপনা ও জনবহুল স্থানে ব্যানার টানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপসারণসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
