বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা আজ নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর পাহাড়ধসে ঝরছে একের পর এক তাজা প্রাণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার চট্টগ্রামে রেকর্ড ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত ৪৩ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের শিশুসহ ১৩ জন রয়েছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়াবহতার পেছনে কেবল অতিবৃষ্টিই দায়ী নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটার নেতিবাচক প্রভাব। পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে নির্বিচারে গাছ কাটা এবং পাহাড়ের ঢালে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের ফলে মাটি আলগা হয়ে গেছে। সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রভাবশালী মহলের পাহাড় কাটার মহোৎসব এই বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০০৭ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোতে পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর এবং বনায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আটকা পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী কয়েক দিন এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগ থেকে বাঁচতে হলে স্বল্পমেয়াদী প্রস্তুতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। এখনই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বসবাসরত হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া জরুরি। প্রশাসনের উচিত কোনো প্রকার দেরি না করে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা। কেবল সতর্কবার্তা প্রচার করলেই দায় এড়ানো সম্ভব নয়, বরং প্রাণহানি কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির সাথে এই ভারসাম্যহীন লড়াইয়ে আমাদের টিকে থাকতে হলে পাহাড় রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
