রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, বোস্টনের বিশালাকার জায়ান্ট স্ক্রিনে তখন ভেসে উঠল ‘থ্যাংক ইউ’ বা ধন্যবাদ বার্তা। গ্যালারির এক প্রান্তে তখন ফরাসি সমর্থকদের আনন্দের জোয়ার, নীল জার্সির বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর ফাইনালে ওঠার স্বস্তি। কিন্তু অন্য প্রান্তে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। লাল জার্সির মরক্কান সমর্থকেরা যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। কারও চোখে অশ্রু, কেউ বা নির্বাক তাকিয়ে ছিলেন সবুজ ঘাসের দিকে। মরক্কোর রূপকথার এই করুণ সমাপ্তি ঘটলেও, মাঠের লড়াইয়ে তারা যে বীরত্ব দেখিয়েছে, তা ফুটবল বিশ্ব দীর্ঘদিন মনে রাখবে। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে মাঠ ছাড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।
ম্যাচ শেষে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ উয়াহবি পরাজয়ের গ্লানি ভুলে মাথা উঁচু রেখে কথা বলেছেন। তিনি জানান, তারা কেবল একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেননি, বরং এশিয়া ও আফ্রিকার লাখো মানুষের স্বপ্নকে ধারণ করেছিলেন। উয়াহবি বলেন, “আজ আমরা হেরেছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের স্বপ্নযাত্রা এখানেই শেষ নয়। ভবিষ্যতে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে।” অন্যদিকে, জয়ের পর ফরাসি শিবিরে ছিল লক্ষ্যপূরণের শান্ত তৃপ্তি। কোচ দিদিয়ের দেশম অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে বলেন, “আমরা যেখানে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম, সেখানে পৌঁছেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য পুনরুদ্ধার এবং ফাইনালের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা।”
মাঠের লড়াইয়ে প্রথমার্ধে মরক্কোকে চেনা কঠিন ছিল। তাদের সেই পরিচিত গোছানো আক্রমণ বা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশল দেখা যায়নি। আফ্রিকার সিংহরা মূলত নিজেদের রক্ষণভাগ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ আসে ২৮ মিনিটে, যখন ফ্রান্স পেনাল্টি পায়। কিন্তু মরক্কোর অতন্দ্র প্রহরী ইয়াসিন বুনু কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত স্পট-কিকটি চিলের মতো ছোঁ মেরে আটকে দেন। ফরাসি জার্সিতে টানা ১৫টি সফল পেনাল্টির পর এই প্রথম ব্যর্থ হলেন এমবাপ্পে। বুনুর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স মরক্কোকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিল। বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে মাত্র দুটি গোল হজম করেছেন বুনু, যা তাকে ইকার ক্যাসিয়াস ও ডমিনিক লিভাকোভিচের মতো কিংবদন্তিদের কাতারে নিয়ে গেছে।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স তাদের আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেয়। ম্যাচের ৬০ মিনিটে পেনাল্টি বক্সের প্রান্তে নিজের প্রিয় ‘গোল্ডেন জোনে’ বল পেয়ে যান কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেখান থেকে নেওয়া তার জোরালো শট মরক্কোর জাল কাঁপায়, যা ছিল চলতি বিশ্বকাপে তার অষ্টম গোল। এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, মাত্র ছয় মিনিট পর অর্থাৎ ৬৬ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কোর আক্রমণগুলো আরও এলোমেলো হয়ে পড়ে। আশরাফ হাকিমি চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের রক্ষণভাগ ভাঙা সম্ভব হয়নি।
এই ম্যাচে মরক্কোর রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ আশরাফ হাকিমিও নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ফরাসি ফরোয়ার্ড লাইনের গতির সামনে তাকেও বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ফরাসিদের মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত পাসিং গেম মরক্কোকে নিজেদের অর্ধেই চেপে রাখতে বাধ্য করে। বিশেষ করে ফরাসি উইঙ্গারদের গতি এবং দুর্দান্ত ড্রিবলিং মরক্কোর রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয়। মরক্কো দ্বিতীয়ার্ধে কিছু কাউন্টার অ্যাটাক বা প্রতি-আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করলেও ফরাসি ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় তা গোলবক্সে পৌঁছানোর আগেই ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের অভিজ্ঞতার কাছেই হার মানতে হয় মরক্কোকে। এই হারের মধ্য দিয়ে আটলাসের সিংহদের রূপকথার সমাপ্তি ঘটলেও, তাদের লড়াই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
