উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে পরিচালিত এক দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক অভিযানে ভারতভিত্তিক তিনটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযানে মোট ৩৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং ভাড়াটে খুনের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি পৃথক ফেডারেল অভিযোগপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।
‘অপারেশন হার্ড বল’ নামে পরিচিত এই তদন্তটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৩ বছর বয়সী লরেন্স বিষ্ণোই এবং ৩২ বছর বয়সী সতীন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রার অন্যতম। মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ, এই দুজন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুন মাসে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারেতে একটি গুরুদুয়ারার বাইরে মুখোশধারী দুই বন্দুকধারী ৪৫ বছর বয়সী নিজ্জারকে গুলি করে হত্যা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী অ্যাটর্নি বিল এসাইলি এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “যেসব আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্র ভয়, মাদক ও সহিংসতা ছড়িয়ে সমাজকে অস্থির করে তুলছে, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে। এসব অপরাধীর জন্য বিশ্বের কোথাও কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।” তিনি আরও দৃঢ়ভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ এবং এশিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এসব অপরাধী চক্রকে তাদের যেকোনো আস্তানা থেকে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর।
বর্তমানে লরেন্স বিষ্ণোই ভারতের একটি কারাগারে বন্দী থাকলেও গোল্ডি ব্রার এখনো পলাতক। কৌঁসুলিদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিষ্ণোই নিজ্জারের একটি ছবি এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঠিকানা বন্দুকধারীদের সরবরাহ করেছিলেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, এই অপরাধী চক্রগুলো উত্তর আমেরিকাজুড়ে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও মেথামফেটামিন পাচার করে আসছিল। একই সাথে তারা লক্ষ্য করে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ব্যাপক সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ৪২টি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে। এই অভিযানে প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন, এক কেজি হেরোইন, প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন ডলার নগদ অর্থ এবং এক ডজন আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে, যা এই চক্রগুলোর ব্যাপক কার্যক্রমের প্রমাণ।
আরেকটি অভিযোগপত্রে কানাডার নাগরিক রভিন্দর সিং ধান্দার নেতৃত্বে পরিচালিত একটি মাদক পাচার চক্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ধান্দা বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় শত শত কেজি কোকেন ও মেথামফেটামিন পাচার করতেন। এই ঘটনায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন কানাডীয় নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলেও কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে।
কানাডার কর্মকর্তারা এই অভিযানকে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে একটি বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশটির বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার এটিকে একটি “অসাধারণ দিন” এবং কানাডার বিভিন্ন কমিউনিটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে একটি “গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” বলে অভিহিত করেছেন।
ওয়ার্ল্ড শিখ অর্গানাইজেশন অব কানাডা এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংগঠনটি বলেছে, নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে কানাডা দাবি করেছিল যে নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের সম্পৃক্ততার প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। যদিও ভারত এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে, যার ফলস্বরূপ দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং উভয় দেশ একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের পর শিখ সংগঠনগুলো বিদেশি রাষ্ট্রীয় সংস্থার সম্ভাব্য জড়িত থাকার বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। টরন্টোভিত্তিক শিখ ফেডারেশন বলেছে, “তদন্তকারীরা বিদেশি রাষ্ট্রীয় কোনো যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন কি না এবং এসব নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।” এই অভিযান আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে সহযোগিতার গুরুত্ব এবং একই সাথে জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
