Friday , July 10 2026
Breaking News
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: অনিশ্চয়তার মেঘ, কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের টানাপোড়েন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: অনিশ্চয়তার মেঘ, কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের টানাপোড়েন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত দিলেও একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেছেন যে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক সামরিক হামলার অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে। ট্রাম্পের এমন পরস্পরবিরোধী মন্তব্য এবং তেহরানের বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভিযানের অনুমোদন বিশ্বজুড়ে চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চিরবৈরী এই দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য কঠিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই আকস্মিক বক্তব্য পরিবর্তন তেহরানের উপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলও হতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহী জাহাজে হামলা বন্ধ করতে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের শর্ত মানতে বাধ্য করতেই ট্রাম্প এই পথ বেছে নিয়ে থাকতে পারেন। অতীতেও তিনি এমন কৌশল ব্যবহার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এটি কেবল আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি কৌশল, নাকি যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর মধ্যেও মধ্যস্থতাকারীরা এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতি উত্তেজনাকে আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

যদিও ট্রাম্প পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে বুধবার ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হুমকি দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। যুদ্ধবিরতি রক্ষায় উভয় পক্ষের কর্মকর্তাদের তৎপরতা এখন বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে থাকায় সংঘাত এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে পর্দার আড়ালে সংবেদনশীল আলোচনা টিকিয়ে রাখতে দিনরাত উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ চলছে।

ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা নিয়ে ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে তারা পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার আলোচনা ধীরগতির করার জন্য ইরানকে দায়ী করছে। গত মাসে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটিকে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার পরবর্তী বড় পদক্ষেপ ছিল এই পরমাণু আলোচনা। অন্যদিকে, তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিসংক্রান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করেছে খোদ ওয়াশিংটন। পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারসহ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বলেও ইরান অভিযোগ করেছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক এবং সাবেক মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্টাট বলেন, “ট্রাম্প যা-ই বলুন না কেন, আমরা এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি।” তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, যুদ্ধবিরতির মূল ভিত্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়াটাও একধরনের আলোচনার কৌশল। তবে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে বলেছেন, “আমি মনে করি এটি শেষ।” আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত নই, আমি আর কোনো চুক্তি করতে চাই কি না।”

ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসন বারবার প্রাথমিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে তাদেরও উপযুক্ত জবাব দিতে হয়েছে। আলোচনার কৌশলগত দিক থেকে, এর আগেও ট্রাম্প তার হুমকি জোরদার করেছিলেন। মার্কিন বাহিনী ইরানের সেতু, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, “আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।” গত মাসে যুদ্ধ অবসানের ৬০ দিনের সাময়িক চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেও তিনি এমন চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প সবসময়ই সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে আলোচনা করতে পছন্দ করেন। এবারের নতুন হামলার মাধ্যমে তিনি হয়তো দর-কষাকষির বাড়তি সুবিধা খুঁজছেন। তবে যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ঘোষণা করার ফলে ইরানও সামরিকভাবে মুক্ত হয়ে যেতে পারে, যা তেলের বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক পরিচালক আলী বায়েজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এবার এই হুমকি দেওয়ার কৌশলটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, “কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ না করে সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা স্পষ্ট। তবে জোরপূর্বক দর-কষাকষি একটি বিপজ্জনক খেলা। যেকোনো মুহূর্তে এই চাপ নিজস্ব গতি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা এড়ানোর জন্যই মূলত এই চেষ্টা।”

তবে বায়েজ এটাও যোগ করেন, ইরানের এখনো আলোচনার টেবিলে ফেরার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, সাময়িক চুক্তির আওতায় যে অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা তেহরানের এখন ভীষণ প্রয়োজন। এই সংকটের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প নিজেও দ্বিমুখী বার্তা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দাবি করে আসছিলেন যে, মার্কিন নাগরিকদের জন্য তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি ইরানের ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু পরে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতেই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় তেলের দাম বাড়লে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির জন্য বাড়তি খরচ করতে হবে। এতে ট্রাম্পের দলের ওপর চাপ পড়তে পারে। এ হিসাবও মাথায় রাখতে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

এছাড়াও

চার্লি কার্ক হত্যা মামলা: অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির চাঞ্চল্যকর তথ্য আদালতে প্রকাশ

চার্লি কার্ক হত্যা মামলা: অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির চাঞ্চল্যকর তথ্য আদালতে প্রকাশ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত চার্লি কার্ক হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক শুনানিতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *