দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সুসংহত ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১২তম বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকারের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো শিল্পায়ন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় সেবা সহজ ও সমন্বিত করা।
নতুন এই আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)-এর মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আসবে। বর্তমানে এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত অসামঞ্জস্যতা এবং দায়িত্বের দ্বৈততা পরিলক্ষিত হয়, যা নতুন আইনের মাধ্যমে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সমন্বিত বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে উঠবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবটি বিস্তারিত আলোচনার পর অনুমোদন লাভ করে। প্রস্তাবিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইনটি দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া, বিভিন্ন প্রণোদনা প্রাপ্তি, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে। এটি মূলত একটি ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা একক জানালা পদ্ধতির দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই প্রয়োজনীয় সব সেবা পাবেন।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে বেশ কিছু যুগান্তকারী বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সুবিধা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদান, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগের পথ সুগম হবে এবং অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে বলে সরকার মনে করছে।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলসহ দেশের ঘোষিত সকল শিল্পাঞ্চলকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতি ও কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন সহজ হবে। এছাড়া, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদানের পদ্ধতি এবং প্রতিটি ধাপের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করবে। ক্ষুদ্র পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে আরও সহজে অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সাথে, দেশের অব্যবহৃত সরকারি জমি, স্থাপনা, শেয়ার ও স্বত্ব উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসা-সংক্রান্ত সকল ধরনের সেবা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার বিধানও এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্য প্রাপ্তি এবং সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করবে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও সহায়ক হবে।
একই মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়া অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ এবং ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’। নতুন জ্বালানি কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অন্যদিকে, নতুন আমদানি নীতি আদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানিপ্রক্রিয়া সহজীকরণ, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল স্থাপন, সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, অনলাইন অনুমোদনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে নতুন সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও মজবুত ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
