রাশিয়ায় উদ্ভাবিত এক ক্যানসার টিকা মেলানোমা আক্রান্ত প্রথম রোগীর শরীরে প্রাথমিক পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে বলে দাবি করেছেন দেশটির গবেষকরা। গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, টিকা গ্রহণকারী ৬০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং তার শরীরে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতি ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতির সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক পরিচালক আলেক্সান্দর গিনজবার্গ গত বৃহস্পতিবার রুশ বার্তা সংস্থা আরআইএ নভোস্তিকে এই সাফল্যের কথা জানান। তিনি বলেন, মানবদেহে এই টিকা প্রয়োগের পর প্রথম রোগীর ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। রোগীর শরীরে এমন সক্রিয় রোগ প্রতিরোধক উপাদান তৈরি হচ্ছে, যা টিউমার এবং এর মেটাস্টেসিস বা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এই তথ্য ক্যানসার গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছর রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত দুটি ক্যানসার চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো উন্নত পর্যায়ের মেলানোমার জন্য তৈরি এমআরএনএ-ভিত্তিক টিকা ‘নিওঅনকোভ্যাক’ এবং অন্যটি কলোরেক্টাল ক্যানসারের জন্য পেপটাইডভিত্তিক ওষুধ ‘অনকোপেপ্ট’। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো নিওঅনকোভ্যাক মানবশরীরে প্রয়োগ করা হয়। ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি তৃতীয় পর্যায়ের মেলানোমা এবং মেটাস্টেসিসে আক্রান্ত, তার শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি মস্কোর হারজেন অনকোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গিনজবার্গ আরও জানান, প্রথম রোগীকে এই টিকার আরও দুটি ডোজ দেওয়া হবে এবং পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া জুড়ে তার রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সাথে, আরও দশজন রোগীর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক মেলানোমা টিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা আগামী দেড় থেকে তিন মাসের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ক্যানসার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার সঞ্চার করেছে, যেখানে প্রতিটি রোগীর টিউমারের জেনেটিক গঠনের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
রাশিয়ার ন্যাশনাল মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার অব রেডিওলজির প্রধান আন্দ্রে কাপরিন এর আগে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি শুধুমাত্র রোগের নিরাময়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত এবং ধ্বংস করার জন্য কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দেয়। এই প্রক্রিয়ায়, রোগীর টিউমার এবং সুস্থ টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করে তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর জন্য একটি স্বতন্ত্র ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়, যা শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষকে চিহ্নিত করতে এবং সেগুলিকে ধ্বংস করতে শেখায়। এটি ক্যানসার চিকিৎসার প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের মতো পদ্ধতিগুলির থেকে অনেকটাই ভিন্ন, যেখানে সুস্থ কোষগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রুশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, কলোরেক্টাল ক্যানসারের জন্য তৈরি অনকোপেপ্ট ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের শরীরেও প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যা এই দুটি দেশীয় উদ্ভাবনের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। গামালেয়া ইনস্টিটিউট কেবল মেলানোমা বা কলোরেক্টাল ক্যানসারেই থেমে নেই; তারা অগ্ন্যাশয়, কিডনি এবং নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যানসারের মতো অন্যান্য জটিল ক্যানসারের জন্যও নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক গবেষণা এবং প্রাথমিক সাফল্য বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার দিকে ইঙ্গিত করছে, যা ক্যানসার রোগীদের জন্য আরও কার্যকর এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত চিকিৎসা নিয়ে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যদিও এটি প্রাথমিক ধাপের সাফল্য, তবে এর বৈশ্বিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
