আমাদের দৈনন্দিন পার্থিব জীবনে কখনো না কখনো অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ, সংকট কিংবা একাকিত্বের ছায়া নেমে আসে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যখন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সহজ পথ চোখে পড়ে না, তখন মানবমনে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের জন্ম নেয়—আল্লাহ কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট? এই দ্বিধাগ্রস্ততার সুযোগ নিয়ে শয়তান মানুষের মনে নানা ধরনের প্রবঞ্চনা সৃষ্টি করে। সে বোঝাতে চায় যে নেমে আসা এই সংকট বা মুসিবত কেবলই আল্লাহর গজব কিংবা অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ। এই নেতিবাচক ধারণার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মানুষ তীব্র হতাশা ও বিষণ্ণতার শিকার হয়। অনেক সময় এই হতাশার কারণেই মানুষ আস্তে আস্তে আল্লাহর প্রদর্শিত সরল পথ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে। ইসলামি জীবনদর্শন এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে এই জটিল প্রশ্নের কোনো একক বা সরলরৈখিক উত্তর নেই। মানবীয় সীমিত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কখনো এটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, ঠিক কী কারণে আল্লাহ নির্দিষ্ট কোনো বিপদ বা পরীক্ষা একজন বান্দার জীবনে পাঠিয়েছেন। কারণ, এর প্রকৃত হেকমত বা প্রজ্ঞা কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আত-তাগাবুনের ১১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না।’ ফলে প্রতিটি মুসিবতের পেছনেই আল্লাহর কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট হিকমত নিহিত থাকে, যা মুমিনের বিশ্বাসের ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
ইসলামের ইতিহাসে প্রখ্যাত মনীষী ও কালজয়ী চিন্তাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাঁর প্রণীত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফাওয়ায়েদ’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাহ্যিকভাবে একই ধরনের বিপদ বা কষ্ট একজন মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত হতে পারে, আবার অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য তা শাস্তির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বিপদের প্রকৃত প্রকৃতি ও ফলাফল মূলত নির্ধারিত হয় সংকটের মুহূর্তে মানুষের অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থান এবং তার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তার ওপর। ইমাম ইবনুল কাইয়িমের মূল বক্তব্য হলো, যদি কোনো বিপদ বা মুসিবত মানুষকে অহংকারী না করে বরং আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে—তাকে তওবা, দোয়া, ইস্তিগফার এবং বেশি বেশি ইবাদত করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং হৃদয়ে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়—তবে সেই বিপদটি ওই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও কল্যাণ বয়ে আনে। বিপরীতপক্ষে, যদি সেই একই বিপদ মানুষকে আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়, তার মধ্যে অহংকার ও অভিযোগের মানসিকতা তৈরি করে কিংবা তাকে স্থায়ী পাপে ও হতাশায় নিমজ্জিত করে, তবে তা অবশ্যই তার জন্য দুর্ভাগ্যের বা শাস্তির কারণ হিসেবে গণ্য হবে। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত যেমন কারও জন্য পরীক্ষা বা শাস্তির কারণ হতে পারে, ঠিক তেমনি বিপদও কারও জন্য আত্মিক উন্নতির সোপান কিংবা চূড়ান্ত ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করতে পারে। তাই যেকোনো অবস্থাকে সরাসরি নিছক রহমত বা শাস্তি বলা যায় না; বরং মানুষের হৃদয়ের বর্তমান অবস্থা এবং তার পরিণতির ওপরই সব নির্ভর করে।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন, ‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ এই আয়াতের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, পার্থিব জীবনে পরীক্ষা আসাটা একটি অবধারিত নিয়ম। বিশেষ করে সংকট ও প্রতিকূলতার সময়েই মানুষের ইমানের দৃঢ়তা ও প্রকৃত রূপের পরীক্ষা হয়। সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের সময়ে আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করা তুলনামূলক সহজ হলেও, কঠিন পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যদি পার্থিব জীবনের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট, বিপদ কিংবা একাকিত্ব মানেই আল্লাহর শাস্তি হতো, তবে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব ও নবী-রাসুলদের জীবনে কোনো ধরনের দুঃখ-যন্ত্রণা বা একাকিত্ব থাকার কথা ছিল না। অথচ ইসলামি ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, নবী-রাসুলগণই মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। কিন্তু তাঁরা প্রতিটি মুহূর্তে এক আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা স্থাপন করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ আল্লাহ তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার ও মর্যাদা দান করেছেন। হাদিসে কুদসিতেও বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঠিক তেমন আচরণই করি।’ তাই সংকটকালে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখাই একজন প্রকৃত মুমিনের প্রধান কাজ।
জীবনে যদি প্রাচুর্য, সুখ, সাফল্য ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকেও, তবুও মানবহৃদয় যদি স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সেই গভীর শূন্যতা দুনিয়ার কোনো সম্পদ দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। কোরআনে কারিমে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, ২৮)। যে মন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, সে বাইরের প্রাচুর্যের মাঝেও ভেতর থেকে অশান্ত ও অতৃপ্ত থাকে। আর তা-ই হলো মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আত্মিক বিপর্যয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ যখন তাঁর কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়াতেই তাকে দ্রুত কষ্টে ফেলেন, যাতে এর বিনিময়ে তার পূর্বের পাপগুলো ক্ষমা হয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, দুনিয়াবি কষ্ট বা বিপদের পেছনে মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি লুক্কায়িত রহমত ও মার্জনার ইচ্ছাই কাজ করে। তাই মুমিনের উচিত বিপদের মুহূর্তে নিষ্ক্রিয় না থেকে তওবা করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। বিপদ যদি মানুষকে পরম সত্তার আরও নিকটবর্তী করে তোলে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই এক বিরাট আশীর্বাদ; আর যদি তা মানুষকে স্রষ্টা থেকে দূরে ঠেলে দেয়, তবেই তা এক কঠিন সতর্কবার্তা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
