দেশের প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামো, শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় অগ্রগতির নতুন পথনির্দেশ নিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশেষ পাবলিক লেকচার। ‘পরিবর্তনের চাবিকাঠি: আজকের জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক এই স্মারক বক্তৃতায় মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুর এলাহী অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো এবং টেকসই সামাজিক উন্নয়নের জন্য নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সার্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দেন।
স্মারক বক্তৃতায় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান একটি দেশের সামগ্রিক রূপান্তরের প্রধান ছয়টি চালিকা শক্তি চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো—ভাষ্য বা ন্যারেটিভ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সামাজিক নীতি-রীতি বা নর্মস, ব্যক্তিক ও সমষ্টিগত উদ্যোগ, ক্ষমতার সমীকরণ এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে এসব চালিকা শক্তির ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক চর্চা জাতীয় অর্থনীতিকে হয় গতিশীল করে, না হয় স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে বলে তিনি অভিমত জানান।
বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) মতো সস্তা শ্রমনির্ভর বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে আছে। অর্থনীতির এই চিরাচরিত মডেল থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমানের ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রকৃত চর্চা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একইসঙ্গে তরুণের আধিক্য তথা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুফল বাস্তবে রূপ দিতে না পারায় আমাদের পুরো অর্থনীতি একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আটকে গেছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক এই রূপান্তর বাস্তবায়নে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। প্রথমত, রাষ্ট্র ধারণার আমূল সংস্কার প্রয়োজন—যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে জনগণের অভিভাবক ভাবার পরিবর্তে ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে গণ্য করবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে যে পেশাদারত্বের ঘাটতি রয়েছে তা দূর করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দূরদর্শিতার ওপর ভিত্তি করে দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা রূপরেখা প্রণয়ন করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বা নর্মসের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা আবশ্যক বলে তিনি মনে করেন।
ইতিহাসের বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্র্যাকের চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে এ দেশের মানুষের মধ্যে সবসময় ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান ছিল। জাতীয় প্রতিটি সংকটকালে সাধারণ নাগরিকদের উদ্ভাবনী চিন্তা, সহনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছে। নাগরিক সমাজের এই অদম্য শক্তির ওপর আস্থা রাখাই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, আমাদের বর্তমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সুফল সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ন্যায্যতার যে চরম ঘাটতি রয়েছে তা নিরসনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতগুলোতে রাষ্ট্রের বিশেষ নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এর আগে স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান প্রধান বক্তাসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানে ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যান্য সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
