বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার সঙ্গে সংগ্রাম করছে, যা নতুন একটি গবেষণায় আবারও উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সমস্যাগুলো কেবল অর্থের অভাবের কারণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনার গভীরে প্রোথিত দুর্বলতার ফল। প্রায় দুই বছর আগে পরিচালিত একই প্রতিষ্ঠানের একটি গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল, যা ইঙ্গিত করে যে সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের এবং নিরন্তর বিদ্যমান। দেশের ২২টি হাসপাতালের ওপর পরিচালিত এই গবেষণাটি যদিও সীমিত পরিসরের, কিন্তু এর ফলাফল সমগ্র জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রায়শই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বা অপারেটর থাকলেও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির কারণে সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ইমেজিং সেবার জন্য সোনোগ্রাফার এবং প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে, যা রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা পেতে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশের সরকারি হাসপাতালে ৫২ শতাংশ রোগনির্ণয় যন্ত্র অচল বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, যা সম্পদের অপচয় এবং সেবার মান হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
যন্ত্রপাতি অচল থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (NEMEMWTC) যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকলেও, তাদের কার্যক্রম মূলত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হয় না। এমনকি, স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে মেরামত করতে চাইলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রায়শই NEMEMWTC-এর অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মূল্যবান যন্ত্র স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে, যা সেবার মান ও কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
একটি কার্যকর ডায়াগনস্টিক সেবা প্রদানের জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও সরঞ্জাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ—একসাথে প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এই উপাদানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব রয়েছে। এর যেকোনো একটির অনুপস্থিতি পুরো ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলে, যার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হন সাধারণ রোগীরা। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয় থেকে বঞ্চিত করে এবং তাদের বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যা স্বাস্থ্যসেবার খরচ বৃদ্ধি করে।
সরকারের জনবল নিয়োগ পরিকল্পনাতেও বড় ধরনের ঘাটতি স্পষ্ট। চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হলেও কারিগরি জনবল নিয়োগে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদানে কারিগরি কর্মীরা অপরিহার্য। জনগণের কাছে কতজন চিকিৎসক বা নার্স নিয়োগ হলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রয়োজনের সময় তাঁরা সহজে ও হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন কি না। এই ভারসাম্যহীন নিয়োগ নীতি সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে।
ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর এমএসআর (মেডিকেল, সার্জিক্যাল ও রিহ্যাবিলিটেশন) ফান্ডের একটি বড় অংশ এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি (EDCL) থেকে ওষুধ কেনার জন্য নির্ধারিত। তবে EDCL-এর সরবরাহ সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সময়মতো ওষুধ পৌঁছানো প্রায়শই সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, সময়মতো ওষুধ সরবরাহ না হলে বা বিকল্প উৎস থেকে স্থানীয়ভাবে কেনার অনুমোদন না পাওয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়। এর ফলে রোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হন এবং উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়।
গবেষণার প্রধান গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ জোর দিয়ে বলেছেন যে, উল্লিখিত সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং জনবল, যন্ত্রপাতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি একটি অপরটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না; পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন। এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে অবশ্যই নীতি নির্ধারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণসহ সকল ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশের সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
