চট্টগ্রামের দোহাজারীতে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন মোরশেদ আলম (২৫) নামের এক যুবক। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর শরীরের একাধিক অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি ও ডান পায়ের পাতা সম্পূর্ণ থেঁতলে গেছে এবং বাঁ হাতের তিন থেকে চারটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার জন্য ভিডিও তৈরির বিপজ্জনক প্রবণতা কীভাবে মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে, এই ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে, যা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। আহত মোরশেদ আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের তৈয়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা। দোহাজারী রেলস্টেশনের মাস্টার নেছার উল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল চারটা ৫০ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তেলবাহী একটি ট্রেন দোহাজারীর পিডিবি তেল ডিপোতে প্রবেশ করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মোরশেদ আলম তাঁর স্ত্রী এবং এক বছর বয়সী কোলের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে রেললাইনের ওপর অবস্থান করছিলেন এবং সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করার জন্য ভিডিও বানাচ্ছিলেন।
রেলওয়ে সূত্রে আরও জানা গেছে, ওই সময় ট্রেনটি শান্টিংয়ের প্রক্রিয়ায় পেছন থেকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনটি ট্রেনের পেছনের অংশে থাকায় চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বারবার হর্ন বাজিয়ে এবং সাইরেন দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু মোরশেদ ও তাঁর পরিবার ভিডিও তৈরিতে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে তাঁরা চারপাশের পরিবেশের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। ট্রেনটি যখন একদম কাছে চলে আসে, তখনো তাঁরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাননি, যার ফলে এই আকস্মিক ও মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর পরই রেলওয়ের তিনজন সতর্ক কর্মচারী এবং স্থানীয় উৎসুক জনতা দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় ওই যুবককে উদ্ধার করে রিকশায় করে দোহাজারী হাসপাতালে নিয়ে যান।
দোহাজারী হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক মুহাম্মদ রকিবুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, মোরশেদ আলমকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া ছাড়া সেখানে করার আর কিছু ছিল না। তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি এবং ডান পায়ের পাতা মারাত্মকভাবে থেঁতলে যাওয়ার পাশাপাশি বাঁ হাতের একাধিক আঙুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির নিজের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং সঙ্গে থাকা শিশু ও পরিবারের সদস্যদেরও চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার মানসিকতা যুবসমাজকে অন্ধ করে তুলছে। রেললাইন, চলন্ত ট্রেন, কিংবা গভীর খাদের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক স্থানে গিয়ে সেলফি বা রিলস বানানোর প্রবণতা এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও সচেতন মহল বারবার সতর্ক করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেনতনার অভাব রয়েছে। এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তরুণ সমাজ এই ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে দূরে থাকে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
