Saturday , July 25 2026
Breaking News
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কলমে অভয়পুর রাজবাড়ির অলৌকিক আখ্যান: অপূর্ণ প্রেমের পূর্ণতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কলমে অভয়পুর রাজবাড়ির অলৌকিক আখ্যান: অপূর্ণ প্রেমের পূর্ণতা

আষাঢ় মাসের এক স্নিগ্ধ, রহস্যময় আবহে অভয়পুর রাজবাড়ির এক অলৌকিক প্রেম কাহিনীর উন্মোচন ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর কলমে। তামিম নূরানী প্রেমা নামের ওই শিক্ষার্থীর লেখা ‘অপূর্ণতার পূর্ণতা’ শিরোনামের এই হৃদয়স্পর্শী আখ্যানটি সম্প্রতি নাগরিক সংবাদ প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়ে পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছে। ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির পটভূমিতে সেট করা এই গল্প এক গভীর ভালোবাসা, মর্মান্তিক বিচ্ছেদ এবং গল্পের মাধ্যমে সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দানের এক অনন্য প্রচেষ্টার চিত্র তুলে ধরে। এটি কেবল একটি ভৌতিক গল্প নয়, বরং প্রেম, ত্যাগ এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে আত্মার মুক্তি পাওয়ার এক প্রতীকী যাত্রা।

গল্পের শুরু হয় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্টকে কেন্দ্র করে। আষাঢ়ের প্রশান্তি নিয়ে লেখকের মন যখন উচ্ছ্বসিত, তখনই অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজনে তিনি তার দলের দুই সদস্যকে নিয়ে অভয়পুর রাজবাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই প্রাচীন ও পরিত্যক্ত রাজবাড়িটি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্যের খোঁজে গবেষক দল প্রবেশ করে এক জরাজীর্ণ প্রাসাদে, যেখানে লতা-পাতা আর ধুলোবালির স্তূপ অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে লেখকের চোখ পড়ে একটি ধুলামাখা ছবির দিকে। ছবিটিতে দেখা যায় এক অপূর্ব সুদর্শন যুবক, যার পরনে পাঞ্জাবি এবং কাঁধে শাল। ১৮৮০ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ের সেই ছবিতে যুবকের মায়াবী চোখ লেখকের মনে এক গভীর কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, যা তার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।

ছবিটির রহস্য উন্মোচনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় লেখক পরদিন একাই ফিরে যান রাজবাড়িতে। এবারের ফিরে আসাটা ছিল এক রোমাঞ্চকর এবং ভীতিকর অভিজ্ঞতার সূত্রপাত। প্রবেশ করেই তিনি লক্ষ্য করেন, গতকাল যে টেবিলে ছবিটি রেখে এসেছিলেন, সেটি আর সেখানে নেই। এমন সময় হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে অন্ধকার নেমে আসে এবং শুরু হয় তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। বিদ্যুতের ঝলকানি আর দমকা হাওয়ার মধ্যে পুরোনো রাজবাড়ির নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়। ভয়ের এক অদ্ভুত অনুভূতি লেখকের সারা শরীরকে আচ্ছন্ন করে তোলে। এমন সময়েই ঠিক আগের দিনের মতো এক শীতল হাওয়া তার গায়ে লাগে এবং তিনি পেছনে কারো উপস্থিতি টের পান। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে থাকে এবং কাঁধে এক অদ্ভুত স্পর্শের পর চোখের সামনে হাজির হয় সেই ছবির যুবকটি—যেন সময়ের দেয়াল ভেঙে সে উপস্থিত হয়েছে বর্তমানের প্রাঙ্গণে। লেখকের চিৎকারে পুরো রাজবাড়ি কেঁপে উঠলেও যুবকটি নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছুক্ষণ নির্বাক থাকার পর যুবকটি জানালার কাছে গিয়ে বৃষ্টি দেখতে শুরু করে। লেখক ভয়ে ভয়ে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “বৃষ্টি পছন্দ করো?” উত্তরে যুবকটি তার হৃদয়বিদারক গল্প বলতে শুরু করে। সে জানায়, একসময় বৃষ্টি তার প্রিয় ছিল, কিন্তু বজ্রপাতে তার প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পর সেই বৃষ্টিই তার জীবনে আজীবন ঝড় হয়ে নেমে এসেছে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে হারানোর বেদনা সইতে না পেরে সে নিজের প্রাণ নিয়েছিল। সে এখন আর রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং যন্ত্রণাকাতর এক অভিশপ্ত আত্মা, যে ‘অপূর্ণতার’ কষ্টে ভুগছে এবং মুক্তি পায়নি। লেখকের মনে ভয় না জন্মে বরং গভীর সহানুভূতি তৈরি হয় এই অভিশপ্ত আত্মার জন্য। গল্প বলার একপর্যায়ে যুবকটি অদৃশ্য হয়ে যায়, আর ততক্ষণে ঝড়ও থেমে যায়।

এই অলৌকিক অভিজ্ঞতা লেখকের মনে এক গভীর ছাপ ফেলে। তিনি উপলব্ধি করেন, বাস্তবতায় যে প্রেম অপূর্ণতা নিয়ে সমাপ্ত হয়েছে, কল্পনার জগতে তাকে পূর্ণতা দেওয়া সম্ভব। পরদিন তিনি আবার রাজবাড়িতে ফিরে আসেন, তবে একা নন, সঙ্গে নিয়ে আসেন নিজের হাতে লেখা এক পূর্ণতার গল্প। যে স্থানে যুবকটি তার অপূর্ণতার গল্প বলেছিল, ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখক রাতভর তার রচিত সেই ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ আখ্যান পাঠ করেন। গল্প শেষ হতেই যুবকটি আবার আবির্ভূত হয়, তার চোখে জল। লেখক প্রশ্ন করেন, “তোমার অনুমতি ছাড়া তোমার প্রিয়া আর তোমার প্রেমের পূর্ণতা দিয়েছি। তুমি কি রাগ করেছ?” যুবকটি হেসে উত্তর দেয়, “জানি না বাস্তবে আমাদের পূর্ণতা এত সহজ হতো কি না। তবে বাস্তবে পূর্ণতা না পেয়েও যে গল্পে পূর্ণতা পেয়েছি, এতেই আমার শান্তি। হয়তো আমি কখনোই আমার প্রিয়ার সঙ্গে থাকতে পারব না, তবে তোমার গল্পের পূর্ণতায় আমি আজীবন থাকব তার সঙ্গে।” এই কথা বলে সে লেখকের হাতে থাকা লেখাটি নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, এবং এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে হাওয়ায় বিলীন হয়ে যায়। এই গল্পটি বাস্তবতার কঠিনতাকে পাশ কাটিয়ে কল্পনার জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে ‘আষাঢ়’ মাস শুধু প্রকৃতির নয়, বরং অপূর্ণ ভালোবাসার পূর্ণতা লাভের এক প্রতীকী মাস হয়ে উঠেছে।

তামিম নূরানী প্রেমা, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তার এই অনন্য সৃষ্টি প্রমাণ করে যে তরুণ লেখকদের সৃজনশীল ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত হতে পারে। পাঠক সমাজের উদ্দেশে তিনি এবং নাগরিক সংবাদ প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জীবনের নানা গল্প, আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পাঠকেরা ই-মেইল করতে পারবেন ns@prothomalo.com ঠিকানায়।

এছাড়াও

বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা: ইতিহাস, সংকট ও উত্তরণের পথ

বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা: ইতিহাস, সংকট ও উত্তরণের পথ

শীতের আমেজে রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলেই একসময় গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট সরগরম হয়ে উঠত বাঁশ ও টিনের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *