শীতের আমেজে রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলেই একসময় গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট সরগরম হয়ে উঠত বাঁশ ও টিনের প্যান্ডেল, বর্ণিল আলোকসজ্জা এবং ঘণ্টার ধাতব শব্দে। ক্যানভাস আর খোলা আসরের সেই উঁচু মঞ্চে অভিনেতাদের গুরুগম্ভীর কণ্ঠে ছুড়ে দেওয়া সংলাপ, ঢোল-কাঁসার সংগীতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিভোর হয়ে থাকত আবালবৃদ্ধবণিতা। এটি কোনো সাধারণ বিনোদন মাধ্যম ছিল না; এটি আবহমান বাংলার আত্মপরিচয় ও লোকসংস্কৃতির সজীব স্মারক—’যাত্রাপালা’। তবে সময়ের বিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তির জয়জয়কার এবং নানা সংকটের মুখে পড়ে বাংলার এই হাজার বছরের প্রাচীন লোকনাট্য শিল্প আজ অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে মুখোমুখি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যাত্রাশিল্পের উৎপত্তির মূল রয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় আচার ও শোভাযাত্রার গভীরে। ‘যাত্রা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ গমন বা যাত্রা করা। প্রাচীনকালে দেব-দেবীর স্মরণে আয়োজিত রথযাত্রা ও উৎসবভিত্তিক নৃত্যানুষ্ঠান থেকে রূপ লাভ করে এই নাট্যধারা। বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক বিস্তারের পর ‘কৃষ্ণযাত্রা’ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও কৃষ্ণের বীরত্বগাথা সংগীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, শ্রীচৈতন্যদেব নিজেও রুক্মিণীর চরিত্রে যাত্রাপালায় অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘লাইলি-মজনু’ কিংবা ‘ইউসুফ-জোলেখা’র মতো লোকজ রোমান্টিক ও পৌরাণিক কাহিনি যাত্রার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান করে নেয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যাত্রাপালা কেবল সামাজিক বিনোদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশপ্রেম ও স্বদেশি আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। চারণকবি মুকুন্দ দাস তাঁর ‘স্বদেশী যাত্রা’র মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী জনমত গঠন, পণপ্রথা দূরীকরণ এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক চেতনাকে কেন্দ্র করে যাত্রাপালা নতুন প্রাণ পায় এবং গ্রামীণ বিনোদনের শীর্ষস্থানে অবস্থান ধরে রাখে।
একটি যাত্রাদল মূলত একটি ভ্রাম্যমাণ পরিবার বা সমাজের মতো কাজ করত। ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এই দলে অভিনেতা, অভিনেত্রী, বাদ্যযন্ত্রী, প্রম্পটার, রূপসজ্জাকর থেকে শুরু করে পাচক পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ভূমিকা পালন করতেন। বিশেষ করে শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস এবং দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক সময়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে তারা প্রদর্শনী পরিবেশন করতেন। এটি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার বিশেষ সাংস্কৃতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।
তবে আশির দশকের পর থেকে এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে ধস নামতে শুরু করে। একদিকে যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত অশালীন পরিবেশনা ও জুয়ার অনুপ্রবেশের কারণে সুস্থ ধারার নাট্যচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে প্রযুক্তির বিকাশ—টেলিভিশন, সিনেমা এবং বর্তমানে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের আধিপত্য গ্রামীণ যাত্রার দর্শক ছিনিয়ে নেয়। পর্যাপ্ত স্পন্সরশিপের অভাব এবং আর্থিক সংকটে পড়ে শত শত যাত্রাদল বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু অভিজ্ঞ শিল্পী পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে সরকারিভাবে যাত্রা নীতিমালার গেজেট প্রকাশ ও নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিল্পটির পুনর্জাগরণ এখনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমানের পরিবর্তিত পেক্ষাপটে কিছু দল আধুনিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক সংকট নিয়ে নতুন ধাঁচের যাত্রা প্রদর্শনী নির্মাণের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশিষ্ট সংস্কৃতিজনদের মতে, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি অনুদান বৃদ্ধি, পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে লোকশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
