আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতে এক গভীর ও নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রবীণ বা মধ্যবয়সী নাগরিকদের নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক বয়ান এবং আজকের তরুণ প্রজন্মের স্বাধীন চিন্তার মধ্যে ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। এক দশক আগে যে প্রজন্মটি প্রধানত হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিল এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি অন্ধ সমর্থন জুগিয়েছিল, আজকের তরুণ সমাজ তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে। ২০০৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপ এবং এর পরের বছর ইনস্টাগ্রামের আবির্ভাব বিশ্বজুড়ে যোগাযোগের ধরন পুরোপুরি পাল্টে দেয়। বর্তমান বিশ্বে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী তিনশ কোটির বেশি হলেও, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি তরুণ প্রজন্মের আকর্ষণ অভাবনীয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রজন্ম আর প্রথাগত রাজনৈতিক অনুশাসন বা পারিবারিক রাজনৈতিক নির্দেশিকা মেনে চলতে নারাজ।
পরিবারগুলোর অভ্যন্তরেও এই প্রজন্মের ব্যবধান স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। মধ্যবয়সী বা পঞ্চাশোর্ধ্ব অভিভাবকরা, যাঁদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’ হিসেবে পরিচিত, ফরোয়ার্ড করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁরা প্রায়শই সন্তানদের ওপর নির্দিষ্ট জীবনযাপন, পোশাক, এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় অভ্যুদয় ঘটা এই নতুন প্রজন্ম তথাকথিত সেই নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে। তারা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজস্ব মত প্রকাশের নিরাপদ মাধ্যম বা ‘ডিজিটাল আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কৌশল এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমগুলো আধুনিক প্রজন্মের ওপর কাজ করছে না। পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা বা রাষ্ট্রযন্ত্র যখন এই তরুণদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়, তখন তাদের নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত পেশিশক্তি বা প্রশাসনিক বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সামাজিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
এই প্রজন্মগত ব্যবধান কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় দেখা গেছে যে তরুণ ভোটাররা প্রথাগত দলগুলোর পরিবর্তে উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি বা তারকাদের পক্ষে মাঠে নেমেছে, যেখানে তাদের অভিভাবকরা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেই যুক্ত রয়েছেন। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও দেখা গেছে, প্রবীণ রাজনীতিকদের ইসরায়েলপন্থি বা আগ্রাসী সামরিক নীতির তীব্র সমালোচনা করছে খোদ তাঁদেরই সন্তানরা। অর্থাৎ, ডিজিটাল মাধ্যমের সুবাদে তথাকথিত জাতীয়তাবাদী বা রক্ষণশীল বয়ান এখন তরুণ প্রজন্মের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী যখন এই স্বাধীনচেতা তরুণদের বোঝাতে বা নিজেদের পক্ষে টানতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে যে, এভাবে বলপ্রয়োগ করে কত দিন একটি স্বাধীনচেতা প্রজন্মকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব এবং অভিভাবকশ্রেণি কবে উপলব্ধি করবেন যে এই তরুণসমাজ আসলে তাদেরই নিজেদের রক্তমাংসের সন্তান।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
