Friday , July 24 2026
Breaking News
চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বনে হাতির বাঁশবাগান উজাড়: লোকালয়ে প্রবেশের আশঙ্কায় বাড়ছে উদ্বেগ

চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বনে হাতির বাঁশবাগান উজাড়: লোকালয়ে প্রবেশের আশঙ্কায় বাড়ছে উদ্বেগ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় অবস্থিত চুনতি সংরক্ষিত বনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বন্য হাতির প্রধান খাদ্য উৎস বাঁশবাগান উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, এই বাঁশবাগান ধ্বংসের ফলে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং খাদ্য সংকটে বন্যপ্রাণীগুলো লোকালয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হতে পারে, যা মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে। স্থানীয়দের দাবি, এই বনটি দীর্ঘদিন ধরে বন্য হাতির খাদ্য সংগ্রহের অন্যতম প্রধান স্থান। প্রায় আট একর আয়তনের একটি বাঁশবাগানের একাংশ ইতিমধ্যেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে, যা পরিবেশবিদ ও বন গবেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

লোহাগাড়া উপজেলা সদর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত চুনতি হাজী রাস্তার মাথা এলাকা থেকে গ্রামীণ সড়ক ধরে আরও কিছুটা ভেতরে গেলে নয়াপাড়া এলাকায় ‘বাঁশবাগান পাহাড়’ নামে পরিচিত একটি টিলা দেখা যায়। প্রায় আট একর বিস্তৃত এই পাহাড়টির একটি সিন্ডিকেট কর্তৃক বাঁশ কাটার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, পাহাড়ের অধিকাংশ এলাকা এখনো বাঁশঝাড়, বনজ গাছপালা ও লতাপাতায় ঢাকা থাকলেও, দক্ষিণ দিকের প্রায় এক একর জায়গা সম্পূর্ণরূপে উজাড় করে পরিষ্কার করা হয়েছে। এই উচ্ছেদকৃত এলাকায় হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে তিন দিন আগেও বুনো হাতির দল সেখানে কচি বাঁশ খেতে এসেছিল। বন থেকে বাঁশ ও গাছ কেটে ফেলার চিহ্ন এখনো স্পষ্ট, কোথাও গোড়াসহ বাঁশ তুলে নেওয়ায় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ির নিচের অংশ রয়ে গেছে। ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতেও বন উজাড়ের দৃশ্য পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে।

বন্য হাতির খাদ্যাভ্যাসে বাঁশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় বনাঞ্চলে, যেখানে হাতির বিচরণ ক্ষেত্র সীমিত হয়ে আসছে, সেখানে বাঁশবাগান তাদের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। চুনতি বনের এই বাঁশবাগান উজাড় হওয়ার ফলে হাতির খাদ্যশৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বন গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, খাদ্যের অভাবে হাতি তার প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছেড়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এবং প্রাণহানির ঘটনা, যা ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলে মানুষ-হাতি সংঘাতের মূল কারণ, আরও বৃদ্ধি পাবে। এই সংঘাত কেবল হাতির অস্তিত্বের জন্যই হুমকি নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই বাঁশবাগান উজাড়ের সাথে জড়িত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় তিনজন বাসিন্দা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন যে, স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালামের নেতৃত্বে প্রায় আট সদস্যের একটি দল এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। গত রোববার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে বাগানের একাংশ উজাড় করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। এই সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা হলো পর্যায়ক্রমে পুরো বাঁশবাগানটি উজাড় করে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ রোপণ করা। তবে, অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আবুল কালামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জায়গাটি চেনেন না এবং সেটি তার এলাকার নয় বলে দাবি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উচ্ছেদকৃত অংশের সংলগ্ন অনেক বাঁশঝাড়ও ভবিষ্যতে উজাড় করা হবে।

চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের অধীনে এই বাঁশবাগান পাহাড়টি অবস্থিত। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে এই পাহাড়ে বাঁশবাগান তৈরি করা হয়েছিল। সাতগড় বনবিটের বিট কর্মকর্তা বজলুর রশীদ প্রথম আলোকে জানান, তিনি এই বিটে মাত্র দুই মাস আগে যোগদান করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে যারা বাঁশবাগান উজাড় করে বাণিজ্যিক বাগান তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, বন বিভাগ দ্রুত অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাগানো গাছগুলো উচ্ছেদ করবে এবং পুনরায় বাঁশ রোপণ করে বাগানটিকে তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে। একইসাথে, এই উজাড় কাজে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বন গবেষক ড. মো. কামাল হোসেন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “বাঁশ হাতির জন্য একটি অপরিহার্য খাদ্য। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের বাঁশবাগান উজাড় হলে হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয় ও মানুষের কৃষি জমিতে প্রবেশ করবে। এতে মানুষ-হাতি সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে কেবল হাতির জীবন নয়, সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য। এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশের ক্ষতি করে না, দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

চুনতি সংরক্ষিত বনের বাঁশবাগান উজাড়ের ঘটনা বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বিশেষ করে বিপন্ন এশীয় হাতির সুরক্ষায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বন বিভাগের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের উপর এই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং মানুষ-হাতি সহাবস্থান নির্ভর করছে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উজাড় হওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধার অপরিহার্য, অন্যথায় এই অঞ্চলে বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত ক্ষতির সৃষ্টি করবে।

এছাড়াও

পশ্চিমবঙ্গে ভাইপোপন্থী তৃণমূলের অস্তিত্ব থাকবে না: শুভেন্দু অধিকারী

পশ্চিমবঙ্গে ভাইপোপন্থী তৃণমূলের অস্তিত্ব থাকবে না: শুভেন্দু অধিকারী

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যের বিরোধী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *