আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্রযুক্তির দাপটে দেশের শহর থেকে গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও আমূল বদলে গেছে যাতায়াত ব্যবস্থা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আধিপত্যে এখন বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশা। দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা থাকলেও এই পরিবর্তনের ধারায় একদিকে যেমন পরিবেশ ও সড়কের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন লোকজ যোগাযোগের অন্যতম স্মারক। তবে এই যান্ত্রিকতার ভিড়েও লালমনিরহাটে এখনও দেখা মেলে এমন কিছু পেশাজীবীর, যারা স্রেফ জীবিকা নয়, ঐতিহ্য ধরে রাখার এক নীরব সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
লালমনিরহাট শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যান্ত্রিক যানবাহনের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও ২০০৩ সাল থেকে একটানা প্যাডেল চালিত রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন এক প্রবীণ চালক। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা সত্ত্বেও তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় রূপান্তরিত হননি। শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে বাহন চালানো কেবল তাঁর আয়ের মাধ্যম নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে লালন করার এক ব্যক্তিগত অঙ্গীকার। আধুনিক সমাজ যখন গতির পেছনে ছুটছে, তখন তিনি ঐতিহ্য ও নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে অনেক পরিবহন চালকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলার অভিযোগ উঠলেও, এই রিকশাচালক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অবলম্বন করছেন। দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হলেই সন্তুষ্টচিত্তে বাড়ি ফেরেন তিনি। অতিরিক্ত আয়ের লোভ বা যাত্রীদের থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের কোনো প্রবণতা তাঁর নেই। শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট কম দূরত্বের যাত্রীদের সাশ্রয়ী সেবা দেওয়াই তাঁর কাজের মূল ভিত্তি।
বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রার দ্রুতগতির সঙ্গে অতীতের শান্ত ও সুসংহত পরিবহন ব্যবস্থার এক বৈপরীত্য উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায়। অতীতে গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি বা প্যাডেল রিকশার যুগে যাতায়াত ধীরগতির হলেও সড়ক দুর্ঘটনার হার ছিল তুলনামূলক অনেক কম। পরিবেশ দূষণমুক্ত সেই সময়গুলোতে মানবসম্পদ ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চাও ছিল লক্ষণীয়। আধুনিক যান্ত্রিক বাহন যাতায়াতের সময় কমালেও মানুষের জীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশা কেবল যোগাযোগের বাহন নয়, বরং এটি একটি পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্য। অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ভিড়ে যখন বিদ্যুৎ অপচয় ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, তখন এই ধরনের পরিবেশবান্ধব যানবাহনের অবদান অপরিসীম। নিজস্ব সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানানো এবং তা সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
