ফিফা বিশ্বকাপ, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর, কেবল মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর গোল উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর বিশাল বৈশ্বিক আবেদন, গভীর রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে প্রায়শই মাঠের রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, গ্রুপ পর্বের ড্রয়ের ফলাফল কিংবা পর্দার আড়ালে গোপন দেনদরবারের গুঞ্জন জন্ম দেয় অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের। এবারের বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র দলের তারকা ফোলারিন বালোগানের একটি ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শেষ ৩২ রাউন্ডের ম্যাচে লাল কার্ড দেখানোর পরও তিনি নাকি শেষ ষোলোর খেলায় মাঠে নামতে সক্ষম হন। ফিফার এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পর গুঞ্জন ওঠে যে, বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার জন্য নাকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং ফিফায় ফোন করেছিলেন। যদিও এর কোনো দালিলিক প্রমাণ মেলেনি, এই অভিযোগ তীব্র সমালোচনা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়, যা বিশ্ব ফুটবলে ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
একইভাবে, শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার কাছে মিসরের ৩-২ গোলে হারের পরেও এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। মিসরের খেলোয়াড় মোস্তাফা জিকো, ম্যাচের রেফারিং নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সরাসরি মন্তব্য করেন, “ম্যাচটি আগেই ঠিক করে রাখা ছিল। এটা আমাদের দোষ নয়। ওই রেফারি… তিনি একের পর এক আমাদের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে থাকেন। আর্জেন্টিনাকে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের আগাম অভিনন্দন জানিয়ে রাখছি—দেখেটেখে এমনটাই মনে হচ্ছে।” এমন অভিযোগ বিশ্বকাপে পাতানো খেলার পুরনো বিতর্ককে আবারও উস্কে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন রহস্যময় ও বিতর্কিত ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যা আজও অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে এবং ফুটবলপ্রেমীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
**১৯৯৮ বিশ্বকাপ: রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা ও নাইকির চাপ**
১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩-০ গোলে হারের সেই ম্যাচ আজও এক রহস্যে ঘেরা। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও হোটেলে তার কক্ষে হঠাৎ করে এক রহস্যময় খিঁচুনির (সিজার) শিকার হন। প্রথমে তাকে ফাইনালের শুরুর একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় গুরুতর কোনো সমস্যা ধরা না পড়ায় এবং রোনালদো নিজে খেলার জন্য ফিট ঘোষণা করায়, পরবর্তীতে তাকে মাঠে নামানো হয়। পুরো ম্যাচে রোনালদো মাত্র ২০ বার বল ছুঁতে পেরেছিলেন, যা তার মতো একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের জন্য অস্বাভাবিক ছিল। ব্রাজিলের হারের পর ফুটবল বিশ্বে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ডালপালা মেলতে শুরু করে। কেউ কেউ দাবি করেন, রোনালদোকে নাকি জোর করে মাঠে নামানো হয়েছিল। গুঞ্জন ছড়ায়, এর পেছনে ব্রাজিল ও ফ্রান্স সরকারের মধ্যে কোনো গোপন আঁতাত ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি আঙুল ওঠে ব্রাজিল দল ও রোনালদোর ব্যক্তিগত স্পনসর ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকির দিকে। অনেকে মনে করেন, নাইকির বিশাল ব্যবসায়িক চাপের কারণেই অসুস্থ রোনালদোকে ফাইনালে খেলাতে বাধ্য হয়েছিল ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন। এই পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে রূপ নেয় যে, ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) ও নাইকির সন্দেহজনক সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে দেশটির পার্লামেন্টে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সেখানে হাজির হয়ে রোনালদোকে বলতে হয়েছিল যে, নাইকি তাকে ফাইনালে খেলতে বাধ্য করেনি, কিন্তু আজও এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলেনি।
**২০০২ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে রেফারির পক্ষপাতিত্ব**
২০০২ ফিফা বিশ্বকাপের যুগ্ম স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে রেফারির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আজও একটি বড় বিতর্ক। ইকুয়েডরের রেফারি বাইরন মোরেনো শেষ ষোলোতে ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার ম্যাচে তার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য কুখ্যাত। কোরিয়ান বক্সে ফাউলের শিকার হওয়া ইতালির ফ্রান্সেসকো টট্টিকে ‘ডাইভ’ দেওয়ার দায়ে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন মোরেনো, যেখানে ইতালির পেনাল্টি পাওয়ার কথা ছিল। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে একটি প্রশ্নবিদ্ধ পেনাল্টির সিদ্ধান্তও দেন এবং আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোকে করা কনুইয়ের আঘাতকেও পাত্তা দেননি। শেষ পর্যন্ত আন জুং-হোয়ানের ঐতিহাসিক গোল্ডেন গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে ইতালিকে বিদায় নিতে হয়। এই ম্যাচের পর তৎকালীন কিংবদন্তি পেলে বলেছিলেন, ‘রেফারিদের মান খুবই খারাপ, বড্ড নিম্নমানের।’ এমনকি তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারও কিছু সহকারী রেফারিকে ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মোরেনো পরে নিজ দেশে ২০ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন এবং ২০১১ সালে হেরোইন পাচারের দায়ে জেল খাটেন। তবে ২০০২ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে তার বিতর্কিত রেফারিংয়ের পেছনে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ আজ পর্যন্ত মেলেনি, যদিও বিতর্ক রয়েই গেছে।
**১৯৭০ বিশ্বকাপ: গর্ডন ব্যাঙ্কসকে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন**
১৯৭০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। অনেকের মতে, ’৬৬-এর তুলনায় তাদের ’৭০ বিশ্বকাপ দল আরও শক্তিশালী ছিল। মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে তারা ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। যখন মনে হচ্ছিল শিরোপা ইংল্যান্ডেরই হবে, তখনই ঘটে অবিশ্বাস্য এক বিপর্যয়। তাদের বিশ্বসেরা গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার জায়গায় পোস্টের নিচে দাঁড়ান পিটার বোনেত্তি, যিনি দুটি সহজ গোল হজম করেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানি ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয়। সেদিন ব্যাঙ্কস মাঠে থাকলে ম্যাচের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত, এমনটাই বিশ্বাস করেন অনেকে। ঠিক এই কারণেই নাকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’ তাকে বিষ খাইয়েছিল—এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তবে এর কোনো প্রমাণ নেই, পুরোটাই লোকমুখে প্রচলিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। কিন্তু প্রশ্ন আজও তাড়া করে বেড়ায়—ঠিক কী হয়েছিল ব্যাঙ্কসের যে তিনি গ্যাস্ট্রোএন্টারেন্টাইটিস বা পেটের পীড়ায় ভুগে মাঠ ছাড়লেন? মেক্সিকান কোনো ভেজাল খাবার নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র? অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল গেটহাউস বিবিসিকে বলেছিলেন, “ধারণা করা হতো, ব্রাজিলের তৎকালীন সামরিক একনায়কতন্ত্র জনপ্রিয়তা রাতারাতি বাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল, আর আমেরিকানরাও চেয়েছিল তারা যেন ক্ষমতায় টিকে থাকে। তাই ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন—সে সময় অভিযোগটা ঠিক এমনই ছিল।”
**১৯৯০ বিশ্বকাপ: ব্রাঙ্কোকে ওষুধ মেশানো পানি পান করানো**
১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালির তুরিনে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচ চলাকালে মাঠের এক খেলোয়াড়কে সেবাশুশ্রূষা করতে আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগেল দি লরেঞ্জো যখন মাঠে ঢোকেন, তখন তার বাড়িয়ে দেওয়া একটি বোতল থেকে পানি পান করেন ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান তারকা ব্রাঙ্কো। ব্রাঙ্কোর দাবি, পানি পানের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ভীষণ অসুস্থ ও মাথা ঘোরানো অনুভব করতে শুরু করেন। এর মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায়, খেলার ধারার বিপরীতে ক্লদিও ক্যানিজিয়া আর্জেন্টিনার হয়ে জয়সূচক গোল করেন। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ ওঠে, ব্রাঙ্কোর সেই পানির বোতলে ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল। এই অভিযোগের কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও, ঘটনার ১৫ বছর পর আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো বলেছিলেন, ‘আমি বলছি না যে এমন ঘটনা ঘটেনি!’ তার এই মন্তব্য বিতর্ককে আরও উস্কে দেয়।
**১৯৭৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ কি পাতানো ছিল?**
১৯৭৮ বিশ্বকাপ, যার স্বাগতিক ছিল আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ওঠার সমীকরণটা আর্জেন্টিনার জন্য ছিল বেশ কঠিন। ব্রাজিলকে টপকে গ্রুপের শীর্ষে থেকে ফাইনালে যেতে শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হতো আর্জেন্টিনাকে। পেরু ছিল বেশ ভালো দল; তারা স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে এবং নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ড্র করে দ্বিতীয় পর্বে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু সেই পেরুকেই আর্জেন্টিনা অনায়াসে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেয়, যা তীব্র সন্দেহের জন্ম দেয়। সে সময় আর্জেন্টিনা ছিল সামরিক একনায়ক হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার অধীনে। ফলে দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই দাবির পক্ষে তখন কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। তবে ২০১২ সালে পেরুর তৎকালীন সিনেটর জেনারো লেদেসমা একটি বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার শাসক ভিদেলা এবং পেরুর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো মোরালেস বারমুদেজের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয়েছিল। এর বিনিময়ে পেরুর ১৩ জন রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে নিজেদের কারাগারে বন্দী রাখতে রাজি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। বুয়েনস এইরেসের একটি আদালতে লেদেসমা বলেছিলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার কলঙ্কিত ভাবমূর্তি ধুয়েমুছে সাফ করতে ভিদেলার যেকোনো মূল্যে এই বিশ্বকাপ জেতার প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি পেরুর বন্দীদের গ্রহণ করার শর্ত দেন, আর পেরুকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটি ছেড়ে দিতে হবে।’ পেরুর অন্যতম সেরা তারকা হোসে ভেলাস্কেসকে ম্যাচের মাঝপথে তুলে নেওয়াটাও কি ছিল সেই গোপন চুক্তিরই অংশ? প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও ধোঁয়াশায় ঘেরা।
এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার এক জটিল মিশ্রণ। যখনই কোনো বিতর্কিত বা রহস্যময় ঘটনা ঘটে, তখনই এর পেছনে গভীর কোনো রহস্যের গন্ধ খুঁজতে শুরু করেন সবাই। এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সত্যতা প্রায়শই অস্পষ্ট থাকে, কিন্তু তারা ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে টিকে থাকে, যা খেলাটির জৌলুস ও বিতর্ক উভয়কেই বাড়িয়ে তোলে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
