২০১৬ সালের ১ জুলাই। ঢাকার গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে। আজ সেই মর্মান্তিক ঘটনার এক দশক পূর্ণ হলো। সেদিন সন্ধ্যায় একদল অস্ত্রধারী তরুণ রেস্তোরাঁটিতে প্রবেশ করে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে ফেলে। রাতভর চলা এই জিম্মি সংকটে প্রাণ হারান ২০ জন জিম্মি, যার মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। এই নৃশংসতায় কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। মোট ২২ জনের প্রাণহানির এই ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়।
পরদিন ২ জুলাই সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ অভিযানের মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, হামলার নেপথ্যে ছিল নব্য জেএমবি নামক একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী, যারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের আদর্শ অনুসরণ করত। এই হামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক ছিল হামলাকারীদের পরিচয়। তারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বেরসহ পাঁচজন আক্রমণকারী দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ ছিল এবং ‘হিজরত’-এর নামে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছিল।
হোলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারির ধরনে আমূল পরিবর্তন আসে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এটি এক বড় সতর্কবার্তা ছিল যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষা উগ্রবাদ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। এই ঘটনার পর সরকার জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান নেয় এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আজ সেই রেস্তোরাঁর স্থানে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও, সেই রাতের আতঙ্ক ও স্বজন হারানোর আর্তনাদ আজও বাংলাদেশের জনমানসে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। এই ট্র্যাজেডি কেবল শোকের নয়, বরং উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ লড়াইয়ের সংকল্পকেও বারবার মনে করিয়ে দেয়।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
