মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে দেশটির জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি বহাল রেখেছে। এর মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করার প্রচেষ্টা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হলো। এই রায় সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব, যা ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ নামে পরিচিত, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর ‘সিটিজেনশিপ ক্লজ’ দ্বারা সুরক্ষিত। এই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যেসকল ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছেন বা স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ করেছেন এবং দেশটির এখতিয়ারাধীন, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের আবাসস্থলের নাগরিক।’ ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধের পর এটি কার্যকর করা হয়েছিল, মূলত দাসত্ব থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আফ্রিকান আমেরিকানদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। এর ফলে, মার্কিন ভূমিতে জন্মগ্রহণকারী যেকোনো শিশুর, তাদের বাবা-মায়ের আইনি অবস্থা নির্বিশেষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করার অধিকার নিশ্চিত হয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলে এবং পরেও জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই ধারণাকে বহুবার চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বারবার যুক্তি দিয়েছিলেন যে, অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত নয় এবং নির্বাহী আদেশ বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এটি বাতিল করা সম্ভব। ট্রাম্পের এই অবস্থান মূলত তার অভিবাসন বিরোধী নীতির অংশ ছিল, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল অবৈধ অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করা। তার এই প্রচেষ্টা রক্ষণশীল মহলে ব্যাপক সমর্থন পেলেও, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং উদারপন্থীদের কাছে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কারণ তারা এটিকে সংবিধান পরিপন্থী বলে মনে করতেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সেইসব প্রচেষ্টার উপর একটি স্পষ্ট ইতি টানলো। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং এর পরিবর্তন কেবল সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমেই সম্ভব, যা একটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিচারপতিরা সংবিধানের মূল কাঠামো এবং ১৪তম সংশোধনীর সুস্পষ্ট ভাষ্যের উপর জোর দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ এটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যার স্থিতিশীলতা এবং পূর্ববর্তী নজিরের প্রতি শ্রদ্ধাকে পুনর্ব্যক্ত করে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই রায় একটি ‘সাংবিধানিক বিপর্যয়’ থেকে দেশকে রক্ষা করেছে, যা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ধারণাকে উল্টে দিলে সৃষ্টি হতে পারতো।
এই রায়ের পেছনে আদালতের অভ্যন্তরে তীব্র বিতর্ক এবং ভিন্নমত ছিল। বিচারপতি কেতাঞ্জি ব্রাউন জ্যাকসন, তার মন্তব্যে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাসের ভিন্নমতের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিচারপতি থমাস তার ভিন্নমতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং মূল উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিচারপতি জ্যাকসন তার প্রতিবাদে ১৪তম সংশোধনীর সুস্পষ্ট ভাষা এবং এর ঐতিহাসিক প্রয়োগের উপর জোর দেন, যা দাসত্ব থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের নাগরিকত্ব প্রদানের মূল উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে। এই মতবিরোধ আদালতের ভেতরে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার গভীর বিভাজনকে তুলে ধরে।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না, তবে এটি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করলো। এটি অভিবাসন বিতর্ককে নতুন দিকে মোড় নিতে বাধ্য করবে, যেখানে নাগরিকত্বের মূল ভিত্তি নিয়ে বিতর্কের পরিবর্তে হয়তো অন্যান্য আইনি ও প্রশাসনিক সমাধানের দিকে নজর দেওয়া হবে। এই রায় মার্কিন সংবিধানের স্থায়িত্ব এবং এর মৌলিক অধিকারগুলোর সুরক্ষায় আদালতের অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে। এটি ভবিষ্যতে একই ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে কাজ করবে, যা মার্কিন গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
