বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে পরিবর্তন আসা একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। তবে সঠিক যত্ন ও সচেতনতার মাধ্যমে ত্বকের বয়সের ছাপ পড়ার প্রক্রিয়াকে ধীরগতিতে রূপ দেওয়া এবং দীর্ঘসময় ত্বককে সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যান্টি-এজিং বা বয়সের ছাপ প্রতিরোধ সংক্রান্ত নানা তথ্যের জোয়ার দেখা গেলেও, এর মধ্যে বিভ্রান্তিকর ও অকার্যকর ধারণার সংখ্যা কম নয়। রূপবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসাধনীর বাণিজ্যিক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে ত্বকের সুরক্ষায় সঠিক উপাদান নির্বাচন এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণত চোখের চারপাশ, ঘাড়, হাতের পিঠ এবং মুখমণ্ডলে প্রথম বয়সের ছাপ ফুটে ওঠে। এর প্রধান কারণ হলো এসব স্থানের ত্বক তুলনামূলক পাতলা এবং তা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সরাসরি সংস্পর্শে বেশি আসে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় কোলাজেন দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলে ত্বক শুষ্ক ও স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে ফেলে এবং সূক্ষ্ম রেখা বা বলিরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে। তবে পুরুষ ও নারীদের অ্যান্টি-এজিং চাহিদার মূল ভিত্তি মূলত একই রকম। পুরুষদের ত্বক কিছুটা মোটা ও তৈলাক্ত হলেও সানস্ক্রিন, রেটিনয়েড, ভিটামিন সি ও ময়েশ্চারাইজারের মতো মৌলিক চাহিদায় কোনো পার্থক্য নেই; প্রসাধনীতে ‘মেন’ বা ‘উইমেন’ ট্যাগ মূলত বিপণন কৌশলের অংশ।
ত্বকচর্চায় অতিরিক্ত প্রসাধনীর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হিতে বিপরীত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। একই সময়ে একসঙ্গে একাধিক শক্তিশালী উপাদান—যেমন রেটিনল, এএইচএ, বিএইচএ এবং ভিটামিন সি ব্যবহার করলে ত্বকের প্রাকৃতির সুরক্ষাপ্রাচীর বা ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, অতিরিক্ত শুষ্কতা ও ব্রণের উপদ্বপ বাড়তে পারে। তাই স্কিনকেয়ারের ক্ষেত্রে ‘কমই ভালো’ (Less is more) নীতি মেনে চলাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য ভারী ক্রিমের বদলে হালকা বা জেলভিত্তিক প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত। সকালে হালকা ক্লিনজার, ভিটামিন সি, ময়েশ্চারাইজার ও ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন এবং রাতে ক্লিনজার, রেটিনল ও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন মেনে চললে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে সানস্ক্রিনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এসপিএফ ৩০ সানস্ক্রিনই যথেষ্ট। তবে যারা দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করেন বা যাঁদের ত্বক দ্রুত পুড়ে যায়, তাঁদের জন্য এসপিএফ ৫০ বেশি উপযোগী। ঘরের ভেতরে বা গাড়িতে থাকলেও জানালার মাধ্যমে আসা ইউভি রশ্মির হাত থেকে বাঁচতে নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে ত্বকের স্বাস্থ্যে। খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে তা কোলাজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ‘অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন অ্যান্ড প্রোডাক্টস’ তৈরি করে, যা কোলাজেনকে ভঙ্গুর করে তোলে। এর ফলে ত্বক দ্রুত বৃদ্ধ দেখায়। তাই নিয়মিত পর্যপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা ত্বক দীর্ঘদিন সতেজ রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।
বয়স অনুযায়ী অ্যান্টি-এজিং রুটিন তৈরি করা প্রয়োজন। সাধারণত ৩০ বছর বয়স থেকে নিয়মিত রেটিনয়েড ও ভিটামিন সি স্কিনকেয়ারে যুক্ত করা উচিত। ৪০-এর কোঠায় পৌঁছালে পেপটাইড ও প্রয়োজনীয় ডাক্তারি ট্রিটমেন্ট এবং ৫০ বছরের পর ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা ও মেনোপজ-পরবর্তী ব্যারিয়ার রিপেয়ারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এছাড়া বোটক্স, ফিলার বা লেজারের মতো নান্দনিক চিকিৎসা করাতে চাইলে অবশ্যই অভিজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। সীমিত বাজেটে কার্যকর ত্বকের যত্ন নিতে চাইলে একটি ভালো সানস্ক্রিন, ত্বকের উপযোগী ময়েশ্চারাইজার এবং একটি ভালো রেটিনয়েড বা ভিটামিন সি সিরাম—এই তিনটি মৌলিক প্রসাধনীকেই প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
