দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অবৈধ অনলাইন ‘স্ক্যাম সেন্টার’গুলোতে তরুণদের আটকে রেখে সাইবার অপরাধে বাধ্য করার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন পাচারকারী চক্র তরুণ-তরুণীদের কম্বোডিয়া, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে পাচার করে সাইবার ক্রাইম নেটওয়ার্কে বন্দি করছে। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে সম্প্রতি এসব তথ্য ও ভুক্তভোগীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে। অনুষ্ঠানে স্ক্যাম সেন্টার থেকে বেঁচে ফেরা মো. শফিকুল ইসলাম হৃদয় এবং ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ম্যানেজার ও ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘টিআইপি হিরো-২০২৫’ সম্মাননাপ্রাপ্ত আল আমিন নয়ন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় স্ক্যাম সেন্টার সারভাইভার মো. শফিকুল ইসলাম হৃদয় জানান, কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উচ্চবেতনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পরই তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং একটি আবদ্ধ জায়গায় বন্দি করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্রতারণা ও আর্থিক জালিয়াতির কাজে বাধ্য করা হয়। নির্দেশ মেনে কাজ না করলে কিংবা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নেমে আসত অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ডিজিটাল জগতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ভুয়া বিনোয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কীভাবে শত শত নিরীহ যুবককে দাসত্বের মতো অবস্থায় বাধ্য করা হচ্ছে, তার চিত্র তিনি তুলে ধরেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের প্রধান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারকর্মী আল আমিন নয়ন আন্তর্জাতিক এই পাচার চক্রের মেকানিজম ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় দালালচক্র এবং অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির ফাঁদে পড়ে বহু বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে এই জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। তিনি সাইবার স্ক্যাম কেন্দ্রগুলো থেকে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার প্রক্রিয়া, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং তাদের সমাজে পুনরায় পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্তরে অভিবাসন আইনি কাঠামো কঠোর করা এবং পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাইবার পাচার ও স্ক্যাম প্রতিরোধে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাই যথেষ্ট নয়, বরং ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। যেকোনো বৈদেশিক চাকরির ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদিত বিএমইটি (BMET) ডাটাবেজ যাচাই করা, সন্দেহজনক অনলাইন বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া না দেওয়া এবং সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক মানব পাচার রোধে সীমান্ত পাহারা জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়ানোর ওপর অনুষ্ঠানে জোর দেওয়া হয়।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
