বাংলাদেশের বিশেষায়িত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ-প্রতিরোধী বা ড্রাগ-রেজিস্ট্রেট ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ বিস্তার ঘটছে, যা জনস্বাস্থ্য খাতে নতুন এক চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতরেই বহু রোগী মারাত্মক সব জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এসব জীবাণুকে ‘সুপারবাগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৯০ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার একটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের আইসিইউ এবং নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-তে ভর্তি থাকা কয়েক শ রোগীর ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তির সময় যেসব রোগীর শরীরে জটিল বা প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছিল না, তাদের অর্ধেকের বেশি অংশ পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই এসব জীবাণু দ্বারা কলোনাইজড বা সংক্রমিত হয়েছেন। মূলত হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ বা নোসোকোমিয়াল ইনফেকশনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞরা এই গবেষণায় প্রধানত চার ধরনের গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ে, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ বা সেপসিস, মূত্রনালীর ইনফেকশন এবং অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থান পচানোর মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে থাকে। প্রচলিত বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক এসব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকারিতা হারাচ্ছে, যার ফলে চিকিৎসকরা রোগীর জীবন বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাছাড়া, আইসিইউতে আসার আগেই অনেক রোগীর অন্ত্রে নীরবে এই ধরনের ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া অবস্থান করে, যা পরবর্তীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতির মাঝেও আশার আলো দেখিয়েছেন গবেষকরা। আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞদের অপর একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বা আইপিসি (IPC) ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হাত ধোয়া, হাসপাতালের পরিবেশ শতভাগ জীবাণুমুক্ত রাখা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। পরীক্ষামূলকভাবে এই নিয়মগুলো অনুসরণের পর মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং মৃত্যুহারও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, হাসপাতালগুলো রোগ নিরাময়ের প্রধান কেন্দ্র হওয়া উচিত, রোগ অর্জনের স্থান নয়। কিন্তু দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি বর্তমানে এক জ্বলন্ত বাস্তব সংকট। তাই আইসিইউ ও এনআইসিইউর মতো সংবেদনশীল বিভাগগুলোতে কঠোর নজরদারি, উন্নত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অন্যথায় এই ধরনের প্রাণঘাতী সুপারবাগের আক্রমণ এবং অকালমৃত্যুর মিছিল রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
