সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিশ্বে যত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যাটি বাংলাদেশের। এই তথ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এটি দেশের টিকাদান কর্মসূচি এবং সার্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষত শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। সময় মতো চিকিৎসা না পেলে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে হাম নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব, তীব্র ডায়রিয়া এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অপরিণত ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বিশ্বজুড়ে হামের প্রকোপ কমে এলেও বাংলাদেশে এমন ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা এই উচ্চ সংক্রমণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিগুলো ব্যাহত হয়েছিল, যার ফলে অনেক শিশু হামের টিকার ডোজ নিতে পারেনি। এই ‘মিডল চিল্ড্রেন’ বা বাদ পড়া শিশুদের একটি বড় অংশ এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া, কিছু অঞ্চলে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ভুল ধারণা এবং টিকা গ্রহণে অনীহা হামের বিস্তারকে প্রভাবিত করছে। দুর্গম এলাকায় বা বস্তি অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যেকোনো সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি এমনিতেই বেশি, যা হামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে হামের উচ্চ সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই শিবিরগুলোতে ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগের কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব জায়গায় নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং নজরদারি জোরদার করা জরুরি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই পরিস্থিতি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের রূপ নিতে পারে, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতে enorme চাপ সৃষ্টি করবে এবং শিশু মৃত্যুর হার বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সাথে, গণমাধ্যমে হামের ঝুঁকি এবং টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখা দরকার। নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করে যেকোনো নতুন প্রকোপ দ্রুত চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও অত্যাবশ্যক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো ভ্যাকসিন-প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য অগ্রগতির জন্য একটি পিছটান। টেকসই টিকাদান কর্মসূচি, ব্যাপক জনসচেতনতা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ মনোযোগের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায়, এই সংক্রামক রোগটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
