বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ সিটি গ্রুপ। কয়েক দশক ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপণ্য সরবরাহের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এই শিল্পগোষ্ঠী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ও আর্থিক খাতের কঠোর নজরদারির মধ্যে সিটি গ্রুপের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এই সংকট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূলত ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের যে ধারা বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল, বর্তমানে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলসি বা ঋণপত্র খোলা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সিটি গ্রুপের এই সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক করপোরেট সংস্কৃতির একটি প্রতিফলন। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যে অবাধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা হতো, বর্তমানে তার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় অনেক শিল্পগোষ্ঠীই এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনলেও স্বল্পমেয়াদে বড় শিল্পগ্রুপগুলোর জন্য বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সিটি গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া বা সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকার এখন একদিকে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সচল রাখার ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছে।
পরিশেষে, সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। এটি স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে আর রাজনৈতিক পরিচয়ে বা সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার দিন শেষ হয়েছে। এখন প্রতিটি শিল্পগোষ্ঠীকে তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং সুশাসনের ওপর ভিত্তি করেই টিকে থাকতে হবে। সরকার ও আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই সংকট উত্তরণে সহায়তা করে, তবেই দেশের শিল্পখাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায়, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পতন সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
