Friday , July 10 2026
Breaking News
চট্টগ্রামে বন্যার জল নামলেও বাঁশখালীর আট ইউনিয়নে তীব্র দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন

চট্টগ্রামে বন্যার জল নামলেও বাঁশখালীর আট ইউনিয়নে তীব্র দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। যদিও শুক্রবার সকাল থেকে আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এবং সূর্যের দেখা মেলায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা থেকে বন্যার জল কমতে শুরু করেছে, বাঁশখালী উপজেলার আটটি উপকূলীয় ইউনিয়নে এখনও ব্যাপক দুর্ভোগ চলছে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলাতেও অনেক সড়ক এখনো জলমগ্ন থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি, যা দুর্গত এলাকার মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।

বাঁশখালীতে গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত মঙ্গলবার পাহাড়ি ঢলের রূপ নেয়, যা উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নকে প্লাবিত করে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে কিছু কিছু ইউনিয়নে জল নামতে শুরু করলেও, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, কাথারিয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, ছনুয়া, সরল এবং পুঁইছড়ি—এই আটটি উপকূলীয় ইউনিয়নে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে। এসব এলাকায় পানি কমে আসার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাহারছড়া, শেখেরখীল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের অধিকাংশ বসতভিটা এখনো দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে। পানিবন্দী মানুষ শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার তাদের শিশু ও নারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে স্বজনদের বাড়িতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। তবে পুরুষ সদস্যরা ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র রক্ষায় নিজেদের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তারা জানিয়েছেন, গত চার দিন ধরে তাদের রান্না সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা চরম মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ২১২টি গ্রামের মধ্যে অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখনো জলমগ্ন। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিনযাপন করছেন এবং এক লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আলম জানান, ঘর তলিয়ে যাওয়ায় তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ফিরবেন। একই এলাকার মোহছেনা খাতুন ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছেন, যা তার সন্তানদের নিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।

খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম সিকদার জানান, স্লুইসগেট দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চললেও অতিরিক্ত জলরাশির কারণে পুরো ইউনিয়ন এখনো প্লাবিত। সরকারিভাবে আড়াই টন চাল ও ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ওসমান গনীও একই চিত্র তুলে ধরেছেন; তার ইউনিয়নের এক হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দী এবং তিন দিন ধরে তাদের চুলা জ্বলেনি। তিনি জানান, সরকারিভাবে পাওয়া দুই টন চাল ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল এবং আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ তৎপরতা আরও বাড়ানো হবে।

এদিকে, চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর নিম্নাঞ্চল থেকে জল নামতে শুরু করলেও, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, ভাঙা সড়ক ও সেতু এবং মাছের খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এখন স্পষ্ট হচ্ছে। হাটহাজারীর শিকারপুর ইউনিয়নে এখনো জল নামেনি। ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা লোকমান হাকিম সপরিবারে গত তিন দিন ধরে রাউজানে মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। দক্ষিণ বুড়িশ্চর, দক্ষিণ মাদার্শা ও উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নেও জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দীঘিনালা-লংগদু এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে টানা তৃতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইহাট-মাচালং-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশও এখনো পানির নিচে। মহালছড়ির একটি সেতু ডুবে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি থেকে খাগড়াছড়ি আসা অনিমেষ চাকমা জানান, পথে চারটি স্থানে জল থাকায় তাকে পাঁচবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং কয়েক স্থানে হাঁটুপানি পেরিয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীর জল কমতে শুরু করায় জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে জল নেমেছে এবং অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে নিম্নাঞ্চলে এখনো জল রয়েছে। দীঘিনালার ইউএনও তানজিল পারভেজ জানিয়েছেন, উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের বেশি পরিবার রয়েছে, যাদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত থেকে জল কমতে শুরু করায় কিছু সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হচ্ছে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষ ও পানিবন্দী পরিবারগুলোর জন্য খাবার, বিশুদ্ধ জল, ওষুধ ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বান্দরবানেও বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর জল নামতে শুরু করেছে, ফলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা এখনো প্লাবিত। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে জল থাকায় শুক্রবারও যান চলাচল বন্ধ ছিল। জেলা সদরের সঙ্গে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন মণ্ডল জানিয়েছেন, বৃষ্টি আগের তুলনায় কমেছে, তবে ১২ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

এছাড়াও

পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল: চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা

পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল: চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে ভয়াবহ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *