ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সম্প্রতি সহায়ক মৃত্যুর (assisted dying) একটি যুগান্তকারী বিল প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করেছে। এই বিলটি টার্মিনালি অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অত্যন্ত কঠোর শর্তসাপেক্ষে জীবনাবসানের একটি পথ খুলে দেবে, যা দেশটিতে কয়েক দশক ধরে চলে আসা এক গভীর নৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিজে এই আইন প্রণয়নের পক্ষে সওয়াল করেছেন, যা ফরাসি সমাজের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফ্রান্স ঐতিহ্যগতভাবে ক্যাথলিক মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত একটি দেশ, যেখানে জীবনের পবিত্রতা এবং মৃত্যু নিয়ে গভীর ধর্মীয় ও দার্শনিক বিতর্ক বিদ্যমান। সহায়ক মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ফরাসি সমাজে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা ও মতভেদ চলে আসছে। এর আগে একাধিকবার এই ধরনের আইন প্রণয়নের চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি, মূলত এর নৈতিক জটিলতা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর তীব্র আপত্তির কারণে। তবে, সম্প্রতি জনমত জরিপে দেখা গেছে, ফরাসি জনগণের একটি বড় অংশ গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এমন একটি বিকল্পের পক্ষে। এই জনমতের চাপ এবং প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত সমর্থন বিলটিকে পার্লামেন্টের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
নতুন অনুমোদিত বিলটি সহায়ক মৃত্যুর ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এর আওতায় আসতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই টার্মিনালি অসুস্থ হতে হবে এবং তার শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণা অসহনীয় ও অপরিবর্তনীয় হতে হবে। আবেদনকারীকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ফরাসি নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে, যিনি সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এবং স্বাধীন ইচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপ রয়েছে: প্রাথমিকভাবে, একজন চিকিৎসকের কাছে আবেদন করতে হবে; এরপর, একটি মেডিকেল বোর্ড বা একাধিক চিকিৎসক স্বাধীনভাবে রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যালোচনা করবেন; নিশ্চিত করা হবে যে রোগী তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল এবং কোনো চাপ ছাড়াই এই অনুরোধ করছেন। বিলটিতে একটি নির্দিষ্ট অপেক্ষার সময়কাল (যেমন, ১৫ দিন) রাখার প্রস্তাবও থাকতে পারে, যাতে রোগী তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। সহায়ক মৃত্যু সাধারণত রোগীর নিজের হাতে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হয়। এটি সরাসরি ইউথানেশিয়া (চিকিৎসক কর্তৃক মৃত্যু ঘটানো) থেকে ভিন্ন, যদিও দুটি বিষয় প্রায়শই একই বিতর্কের অংশ।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তার দ্বিতীয় মেয়াদে এই বিতর্কিত বিষয়ে একটি সমাধান আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, ফরাসি সমাজে এমন একটি আইন প্রয়োজন যা চরম দুর্ভোগে থাকা মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবনাবসানের সুযোগ দেবে। তার এই অবস্থানের কারণে বিলটি পার্লামেন্টে যথেষ্ট রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে, যদিও বিরোধিতা এখনও বিদ্যমান। ম্যাক্রোঁ এই বিলটিকে “সহানুভূতি” এবং “দায়িত্বশীলতা”র একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সহায়ক মৃত্যুর আইন নিয়ে ফ্রান্সে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল আইনি নয়, গভীর নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। এর সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, এটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার (autonomy) এবং দুর্ভোগ থেকে মুক্তির অধিকার নিশ্চিত করে। তারা মনে করেন, যখন সব ধরনের চিকিৎসা ব্যর্থ হয় এবং যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন একজন ব্যক্তির মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকার থাকা উচিত। অন্যদিকে, বিরোধীরা জীবনের পবিত্রতা এবং সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। ক্যাথলিক চার্চ এবং কিছু মেডিকেল গ্রুপ এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে, এর ফলে দুর্বল এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং সমাজ জীবনকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করতে পারে। তারা বরং উন্নত প্যালিয়েটিভ কেয়ার (উপশমকারী চিকিৎসা) ব্যবস্থার ওপর জোর দেন, যা রোগীদের ব্যথা কমানো এবং জীবনের শেষ দিনগুলো আরামদায়ক করতে সাহায্য করে।
ফ্রান্স যদি এই বিলটি আইনে পরিণত করে, তবে এটি ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে যেখানে সহায়ক মৃত্যু বা ইউথানেশিয়া বৈধ। বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্যে ইতিমধ্যেই এমন আইন কার্যকর রয়েছে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ফ্রান্সকে তার নিজস্ব আইন প্রণয়নে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে প্রাথমিক অনুমোদনের পর বিলটি এখন সিনেটে যাবে। সেখানেও এটি বিতর্কের সম্মুখীন হবে এবং সম্ভবত কিছু পরিবর্তনও আসতে পারে। উভয় কক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হবে। এই আইন ফরাসি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু জীবনাবসানের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করবে না, বরং প্যালিয়েটিভ কেয়ারের গুরুত্ব এবং অসুস্থতার সঙ্গে মোকাবিলা করার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে। এটি ফরাসি সমাজকে এমন এক জটিল নৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যার উত্তর খোঁজা সহজ হবে না।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
