টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব শেষে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধ্বংসের প্রকৃত রূপ। বানের পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে। কোথাও ভেঙে পড়েছে বসতবাড়ি, কোথাও ধসে গেছে চলাচলের রাস্তা, আবার কোথাও ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল ও মৎস্য ঘের। ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়েছেন হাজারো মানুষ, যাদের যাতায়াত ও জীবনধারণের ন্যূনতম উপায়টুকুও কেড়ে নিয়েছে এই দুর্যোগ।
কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যোগাযোগ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। কক্সবাজারে বন্যায় প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং জেলার অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে আনুমানিক ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং এলজিইডির আওতাধীন প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও সড়ক যোগাযোগ সচল করতে জরুরি ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকার সংস্কার কাজ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রকৌশলীরা।
অবকাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। বানের পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে ফিরে কৃষকেরা দেখছেন তাঁদের কষ্টের ফসল সম্পূর্ণ পচে গেছে। কক্সবাজারে ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি এবং বিপুল পরিমাণ মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে এবং বহু মাছের খামার ভেসে গেছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে কৃষকেরা চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার মতো সম্বল এখন অধিকাংশ কৃষকের কাছে নেই।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা এই বন্যার কবলে পড়েছে এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। সরকার ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ করেছে। তবে এখনো হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে আছেন এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
