বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য ‘বাংলাদেশি’ একটি অভিন্ন ও মৌলিক পরিচয়, যা জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই ধারণাটি কেবল ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দেশের প্রতিটি মানুষকে এক সুতোয় গাঁথার এক শক্তিশালী বন্ধন হিসেবে কাজ করে। সংবিধান প্রদত্ত এই পরিচয়ের মাধ্যমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিক অভিন্ন জাতীয় সত্তার অংশীদার। এটি একটি অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে অপরিহার্য, যা সকলের মধ্যে সমান অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের বিষয়টি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপে বিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, যা মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে। তবে, ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর সংবিধানের পরিবর্তন আনা হয় এবং ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করা হয়, যা দেশের ভৌগোলিক সীমা ও নাগরিকত্বের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলেও, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি বহাল রাখা হয়। এর মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে ‘বাঙালি’ হলেও, দেশের সকল জাতিগোষ্ঠীর জন্য অভিন্ন নাগরিক পরিচয় হিসেবে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসত্তার ইঙ্গিত বহন করে।
এই ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান বহু জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একীভূতকরণের প্রতীক। পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থেকে শুরু করে সমতলের প্রতিটি নাগরিক এই অভিন্ন পরিচয়ের ছায়াতলে এসে সমান নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেন। এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির পরিচয়ের চেয়েও বৃহত্তর, যা সকল নাগরিককে একটি একক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। এর ফলে, বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের মধ্যেও জাতীয় সংহতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সুদৃঢ় হয়, যা একটি আধুনিক, বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এই পরিচিতি দেশের বহুবিধ সাংস্কৃতিক ধারাকে সম্মান জানিয়েও একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় কাঠামো বজায় রাখার সুযোগ করে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় কেবল একটি প্রশাসনিক বা নাগরিকত্বের বিষয় নয়, এটি একটি গভীর জাতীয় ঐক্য ও চেতনা নির্মাণের হাতিয়ার। তাদের মতে, যখন দেশের সকল নাগরিক একটি অভিন্ন পরিচয়ে আবদ্ধ হন, তখন বিভেদকামী শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি আরও মজবুত হয়। এই ধারণাটি সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অখণ্ড জাতিসত্তা গঠনে সহায়ক। এর মাধ্যমে দেশের সকল নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ আরও সুদৃঢ় হয়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে সর্বদাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে এর প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় কাজ করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়া, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে সকলের সম-অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অভিন্ন পরিচয়কে আরও দৃঢ় করা হয়। সমাজে এই চেতনা যত গভীর হবে, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা তত বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হয়। এটি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথকে মসৃণ করে।
যদিও সময়ে সময়ে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তবুও ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে সকল নাগরিকের অভিন্ন স্বীকৃতি দেশের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে এই চেতনাকে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করার জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও কাজ করতে হবে। এই অভিন্ন পরিচয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতিকেও আরও সুসংহত করে এবং বিশ্ব দরবারে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে দেশের অবস্থানকে মজবুত করে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
