বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের নতুন বৈশ্বিক তালিকায় আবারও শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) এক্সক্লুসিভ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লন্ডনভিত্তিক বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও রেসিডেন্সি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স’ প্রকাশিত সর্বশেষ সূচকে এ তথ্য সামনে এসেছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী পাসপোর্টের এই দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধার বিচারে বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে ও স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকা উত্তর কোরিয়ার সমান স্তরে অবস্থান করছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সিঙ্গাপুরের পাসপোর্টধারীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অভূতপূর্ব অবাধ ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশটির নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই বিশ্বের অন্তত ১৯৫টি গন্তব্যে সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন অথবা পৌঁছানোর পর ‘অন-অ্যারাইভাল ভিসা’ সুবিধা পেয়ে থাকেন। এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাসপোর্ট হিসেবে সিঙ্গাপুর নিজের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে অবস্থান করছে ইউরোপের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন এবং এশিয়ার প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ জাপান। এই দেশগুলোর নাগরিকরা বিশ্বের ১৯২টি দেশে অন-অ্যারাইভাল বা ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে থাকেন।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক এই সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান আশঙ্কাজনকভাবে নিচের দিকে নেমে এসেছে। তালিকার ১০০তম অবস্থানের কাছাকাছি থাকা বাংলাদেশের নাগরিকরা বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ৪০টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। চরম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সার্বিক মানবাধিকার সংকটে থাকা কঠোর সামরিক শাসনাধীন উত্তর কোরিয়ার পাসপোর্টের মানও হুবহু একই। উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরাও মাত্র ৪০টি দেশে একই ধরনের ভিসা সুবিধা পান। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে মালদ্বীপ এবং ভারত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। যদিও পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান সূচকের তলানিতে রয়েছে, তবুও বাংলাদেশের জন্য উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে একই কাতারে অবস্থান করাকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি কেবল ভ্রমণ সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলক। বাংলাদেশে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা, পাসপোর্ট জালিয়াতি রোধে দুর্বলতা এবং পাসপোর্টধারীদের বিদেশে বেআইনিভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতাই এই মানের অবনতির অন্যতম কারণ।
পাসপোর্টের এমন দুর্বলতার কারণে সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে ভিসা প্রসেসিংয়ের দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ ফি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাখানের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাসপোর্টের মানোন্নয়নে সরকারের উচিত কার্যকর ও আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদার করা, দ্বিপক্ষীয় ভিসা মওকূফ চুক্তি সম্পাদন করা এবং দেশের অভ্যন্তরে পাসপোর্টের তথ্য নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিদেশে বেআইনি অভিবাসন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদাহানি অব্যাহত থাকতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
