বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘ ও জটিল স্থলসীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশ-ইন’ এবং বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান রোধ করা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে মাদক, অস্ত্র ও স্বর্ণ চোরাচালানের পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়টি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত সুরক্ষায় সনাতন পাহারার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নীতি-নির্ধারকেরা। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশ ঠিক কতটা প্রস্তুত এবং বর্তমানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
সীমান্তের বিশাল অংশজুড়ে নদী, পাহাড়ি অঞ্চল এবং দুর্গম বনাঞ্চল থাকায় কেবল জনবল দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো অত্যন্ত কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের কিছু স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় ইতিমধ্যে থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আধুনিক রাডার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। যশোর, সাতক্ষীরা এবং কক্সবাজারের মতো কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে এই প্রযুক্তির সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুরো সীমান্ত জুড়েই এই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশ-ইন’ ঠেকাতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত বা নদীমাতৃক এলাকায় ড্রোন দিয়ে আকাশপথে নজরদারি চালানো হলে চোরাকারবারীদের তৎপরতা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক নজরদারি ক্যামেরা ব্যবহার করে সন্দেহভাজন গতিবিধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করার প্রযুক্তিও বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হতে হবে। তবে এই ধরনের প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি বিজিবির সদস্যদের বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যাতে করে কোনো ধরনের উস্কানি বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা এড়ানো যায়। একই সাথে সীমান্তে কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়া কীভাবে কার্যকরভাবে চোরাচালান প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কেবল প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি সমন্বিত কমান্ড সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের চেষ্টা চিহ্নিত হওয়ার পর বিজিবির টহল দল যাতে দ্রুততম সময়ে সেখানে পৌঁছাতে পারে, তার জন্য যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। সার্বিকভাবে, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও শতভাগ ডিজিটাল ও স্মার্ট সীমান্ত গড়ে তুলতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
