ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিমান হামলাগুলোর মধ্যে একটিতে অন্তত ২১ থেকে ২৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (জুলাই ২) গভীর রাতে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, যা শহরের বাসিন্দাদের জন্য এক বিভীষিকাময় রাত নিয়ে আসে। কিয়েভের মেয়র এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে চালানো এই হামলায় শহরের বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্র এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী কিয়েভকে লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শাহেদ-ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে কিয়েভ। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কিছু হামলা প্রতিহত করলেও, বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এই হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, শহরের অনেক অংশ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং জরুরি পরিষেবা বিঘ্নিত হয়।
এই হামলা কিয়েভের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে শহরের মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা যুদ্ধের সময় তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন এক “ভয়াবহ রাতের” কথা, যেখানে বিস্ফোরণের শব্দে শিশুরা জেগে ওঠে এবং প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ছোটাছুটি করে। হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করেন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এই ধরনের হামলা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব ফেলে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, কিয়েভের বেশ কয়েকটি বহুতল আবাসিক ভবন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং কিছু ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়ে। এছাড়া, বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পরিবহন অবকাঠামোতেও আঘাত হানে, যার ফলে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করে, তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ বলে জানানো হয়েছে।
এই হামলা ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান আগ্রাসনের একটি অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়া কিয়েভসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে নিয়মিতভাবে হামলা চালিয়ে আসছে। তবে এবারের হামলাকে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সমন্বিত হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হামলার ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো জোটের সদস্যরা রাশিয়ার এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের ব্যাপক হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেবে এবং শান্তির সম্ভাবনাকে আরও দূরবর্তী করে তুলবে। কিয়েভের ওপর এই হামলা ইউক্রেনের মনোবল ভাঙার এবং দেশটির প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করার রাশিয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ও জনগণ তাদের প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
