২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় এক দশক অতিবাহিত হয়েছে। সেই সময়কার অস্থিরতা কাটিয়ে দেশ বর্তমানে এক নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সচেষ্ট। হোলি আর্টিজানের সেই নারকীয় ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বহু জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শীর্ষস্থানীয় অনেক জঙ্গি নেতার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী মতাদর্শ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার ধরন ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো বড় ধরনের হামলার পরিবর্তে এখন সাইবার স্পেস এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে নতুনদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘লোন উলফ’ বা এককভাবে হামলা চালানোর মতো ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনর্গঠনে কাজ করছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উগ্রবাদ মোকাবিলা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সামরিক বা আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমেই উগ্রবাদ নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে হতাশা রয়েছে তা দূর করার চেষ্টা করছে। কারণ, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই তরুণদের এই হতাশাকে পুঁজি করে তাদের মগজ ধোলাই করে থাকে। হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক পরে এসে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি আগের চেয়ে কমে এলেও, আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের মাধ্যমেই উগ্রবাদের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
