কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে পদ্মা নদীতে শরিফুল ইসলাম ওরফে ববি (৩৮) নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। তিনি স্থানীয় মনি পার্কের মালিক মনিরুল ইসলাম ওরফে মনির দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত। গভীর রাতের এই ঘটনা এবং গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির হাসপাতাল থেকে উধাও হয়ে যাওয়া জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করলেও, ঘটনার পেছনের আসল রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে ভেড়ামারার গোলাপনগর এলাকায় মনি পার্ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীতে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় মনি পার্কের মালিক মনিরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি সম্প্রতি কেনা একটি স্পিডবোটে করে নদীতে ছিলেন। বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই তাকে দ্রুত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে, শুক্রবার সকালের পর থেকে তাকে আর হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হাসান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভর্তি রেজিস্টারে গুলিবিদ্ধ ওই ব্যক্তির নাম পাওয়া গেলেও শুক্রবার দুপুরের দিকে ওয়ার্ডে তাকে পাওয়া যায়নি। রেজিস্টারে আঘাতের কারণ হিসেবে ‘গানশুট’ বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল থেকে একজন গুলিবিদ্ধ রোগীর উধাও হয়ে যাওয়া বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় শরিফুলের স্ত্রী বনি মুঠোফোনে জানান যে, তার স্বামী শরিফুলের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য তারা ঢাকায় রওনা হয়েছেন এবং প্রায় গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঘটনার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছুই জানেন না এবং শরিফুল সুস্থ হওয়ার পর হয়তো পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তার এ বক্তব্য ঘটনার চারপাশে সৃষ্ট রহস্যের জট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জেলা পুলিশের একটি শীর্ষ পর্যায়ের সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, পুলিশ স্পিডবোটটি পরীক্ষা করে দেখেছে। স্পিডবোটের ভেতরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ এবং গুলির সুস্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, বন্দুক শরীরে ঠেকিয়ে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। স্পিডবোটের ভেতর থেকে বেশ কয়েকটি তাজা বুলেটও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে, এসব বুলেট কার ছিল এবং কী কারণে গুলি চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে নিবিড় তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে মনি পার্কের মালিক মনিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে, তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি, যা তদন্তের প্রক্রিয়াকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, গভীর রাতে দলবল নিয়ে স্পিডবোটে করে পদ্মা নদীতে ভ্রমণের বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত, এত গভীর রাতে পদ্মায় এ ধরনের কার্যকলাপ বিরল এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে স্থানীয়রা গুঞ্জন করছেন।
ভেড়ামারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জাহেদুর রহমান প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি জানান, পার্কসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ বিষয়ে যেটুকু বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই রহস্যজনক গুলিবিদ্ধির ঘটনা এবং পরবর্তীকালে রোগীর হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ এখন নিখোঁজ শরিফুলের সন্ধানে এবং ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনে তৎপর রয়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
