রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক প্রতিনিধি সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেছেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান—এই দুই ঐতিহাসিক অর্জনই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের মূল ভিত্তিমূল। শুক্রবার কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন, যারা একাত্তরের ইতিহাস ও অর্জনকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তারা বস্তুত দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ও মূলধারার আদর্শে বিশ্বাস করে না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের মূলধারায় ধারণ করার অর্থ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ গণ-অভ্যুত্থানকে পেছনে ফেলে দেওয়া নয়। চব্বিশের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করে গণতন্ত্র পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিয়েছে। বিএনপি এই উভয় সংগ্রামকেই সমান জাতীয় গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে দেখে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে কোনো ধরণের ধর্মীয় উগ্রবাদ, চরমপন্থা কিংবা মৌলবাদকে স্থান দেওয়া হবে না। বিএনপি একটি সর্বজনীন, উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের হুশিয়ার করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে একটি অশুভ গোষ্ঠী সচেতনভাবে সমাজে ধর্মীয় বিভাজন তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত। এই ধরনের দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী চক্রান্তকে কঠোর হাতে দমনের আহ্বান জানান তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সংবিধান অনুযায়ী দেশের সব ধর্মের মানুষের সমান নাগরিক ও সামাজিক অধিকার বিদ্যমান। কাউকেই ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে দেখার দরকার নেই; বরং নিজেদের নাগরিক অধিকার আদায়ে সব সম্প্রদায়কে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিগত নির্বাচনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিএনপি ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি সমর্থনের কথা স্মরণ করে তাঁদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংকট সমাধানে বর্তমান সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে জানান, দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অবদানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে লালন করেন। সরকারের মূল নীতি হলো—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান সাংবিধানিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় কেবল সাম্প্রতিক ঘটনাবলি না দেখে অতীত ও সার্বিক ইতিহাস বিবেচনা করা দরকার। যেকোনো অপরাধকে ঢালাওভাবে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন না দেখিয়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
সম্মিলিত সনাতন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার আচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৪৬টি সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে মূল বক্তব্য পেশ করেন অশোক তরু সাহা। অনুষ্ঠানে সরকারের কাছে একটি স্বতন্ত্র সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, নির্যাতন ও হামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, ধর্মীয় উৎসবে সরকারি ছুটি সম্প্রসারণ এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরের মতো বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। সভায় সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
