ইসলামি আকাইদ ও শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো সমস্ত নবী ও রাসুলদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ বা বিতর্কের বশে নবীদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি না করা। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো একজন নবীকে ছোট করে অন্যজনের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার সুযোগ ইসলামে নেই। অতীতে একবার মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের দুজন ব্যক্তির মধ্যে নিজ নিজ নবীর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বাকবিতণ্ডা হলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, বিতর্কের উদ্দেশ্যে তাঁকে নবী মুসা (আ.)-এর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া অনুচিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তি মর্যাদা ও বিশেষ স্বাতন্ত্র্যসমূহকে অস্বীকার করা হবে; বরং ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত তাঁর নিজস্ব হাদিসে এমন ছয়টি অনন্য গুণাবলীর কথা বর্ণিত হয়েছে, যা তাঁকে পূর্ববর্তী সকল নবীর থেকে আলাদা মর্যাদা দান করেছে।
সহিহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিসে মহানবী (সা.) নিজেই স্বীয় নবুয়তের ছয়টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্যটি হলো ‘জাওয়ামিউল কালাম’ বা সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবোধক বক্তব্য প্রদানের সামর্থ্য। ইসলামি চিন্তাবিদ ও বুখারি শরীফের ব্যাখ্যাদাতাদের মতে, পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে যেসব হেদায়েত ও বিধান দীর্ঘ অবয়বে অবতীর্ণ হতো, মহান আল্লাহ তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল বাক্যে প্রকাশ করার সক্ষমতা দান করেছিলেন। ফলে তাঁর হাদিসগুলো আয়তনে সংক্ষিপ্ত হলেও তা থেকে বিপুল পরিমাণ ফিকহি বিধান ও নৈতিক শিক্ষা রূপায়িত হয়েছে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে হাদিসে এসেছে, শত্রুভাবাপন্ন বাহিনীর ওপর দূরবর্তী প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন যে, এক মাসের দূরত্বের পথ থেকেও প্রতিপক্ষের অন্তরে একধরনের ভীতি ও প্রভাব সঞ্চারের মাধ্যমে তাঁকে ঐশ্বরিক সহায়তা করা হয়েছিল। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং সত্যের বার্তা সুরক্ষায় এক অলৌকিক মনস্তাত্ত্বিক রূপ হিসেবে কাজ করত। পাশাপাশি তৃতীয় বিশেষ বিধানটি ছিল গনিমত অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ব্যবহারের বৈধতা। পূর্ববর্তী শরিয়তগুলোতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভোগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল এবং তা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হতো, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের জন্য এটি বৈধ ও হালাল করা হয়, যা ইসলামি শরিয়তের একটি স্বতন্ত্র শিথিলতা ও সহজতার বহিঃপ্রকাশ।
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য হলো সমগ্র পৃথিবীকে সালাত ও পবিত্রতার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা। ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতি বা নবীদের অনুসারীদের কেবল নির্দিষ্ট উপাসনালয়ে গিয়ে ইবাদত করতে হতো। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্য ভূমির যেকোনো স্থানকে পবিত্র ও নামাজ আদায়ের উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে, সেইসাথে পানির অনুপস্থিতিতে মাটি দিয়ে তায়াম্মুমের সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যটি ইসলামের সর্বজনীনতা এবং পালনগত সহজতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। যেকোনো স্থানেই একজন মুসলিম আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হতে পারেন।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্যটি হলো বিশ্বজনীন নবুয়ত। পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসুল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, অঞ্চল বা জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। বিপরীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতি ও সৃষ্টিজগতের হেদায়েতের জন্য রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছে। বর্ণনায় এসেছে, তিনি কেবল আরবদের জন্য নন, বরং বিশ্বের সমস্ত মানবগোষ্ঠীর জন্য প্রেরিত সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। এই কারণে তাঁর দাওয়াত কোনো বিশেষ ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়।
সর্বশেষ এবং ষষ্ঠ অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নবুয়তের ধারার সমাপ্তি বা ‘খাতামুন্নাবিয়্যিন’। পবিত্র কোরআনের সুরা আহজাবের ৪০ নম্বর আয়াতে এবং বহু সহিহ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবুয়তের দীর্ঘ ধারার সমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর পরে আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না। এই ছয়টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় বিশ্বমানবতার জন্য ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
