চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে মারধর, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই ঘটনা ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর নাম মো. রায়হান, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায়। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা হলেন মুসাদ্দিকুজ্জামান আল-মামুন, যিনি চবি শাখা ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। রায়হানের অভিযোগ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে ছাত্রদল নেতা আল-মামুন ও তার কয়েকজন সহযোগী তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যান। প্রথমে তাকে স্লুইসগেট এলাকায় নেওয়া হয় এবং পরে পার্শ্ববর্তী ব্রিকফিল্ড এলাকায় নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এ সময় তার মুঠোফোনটিও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মারধরের পাশাপাশি তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একটি ভিডিও বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়। সেই ভিডিওতে তাকে পূর্ববর্তী একটি মারামারির ঘটনায় জড়িত থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়, যদিও রায়হান দাবি করেছেন যে তিনি সেই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত ২৯ জুন রাতের একটি মারামারি থেকে। সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পর্দায় ফুটবল খেলা দেখানো হচ্ছিল। অভিযোগ, ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসা এবং ধূমপান করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইফতেখার দিশানের সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক মুসাদ্দিকুজ্জামান আল-মামুনের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এই ঘটনার জের ধরে পরদিন, ৩০ জুন রাতে, দিশান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলের সামনে ছাত্রদল নেতা আল-মামুনের ওপর হামলা চালান। এরপর শাহজালাল হলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে আসেন শাখা ছাত্রশক্তির মুখ্য সংগঠক উলফাতুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় ছাত্রদল কর্মীরা তার ওপরও চড়াও হন। পরিস্থিতি সামলাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য এবং কর্মরত সাংবাদিকদেরও হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় রায়হানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মুসাদ্দিকুজ্জামান আল-মামুন তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগের একটি ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়ে আমি শুধু রায়হানের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে সময় আমি একা ছিলাম, আমার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। কোনো ধরনের মারধর, হুমকি বা ভিডিও বক্তব্য নেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।” অন্যদিকে, শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, “যদি কেউ কোনো অন্যায় করে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। আর অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি আমাদের কাছে অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরাও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।” তাদের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ছাত্রদল বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পক্ষে।
ঘটনাটি জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, “এক শিক্ষার্থী আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা অভিযোগটি গ্রহণ করেছি। ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হবে এবং তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” প্রক্টর আরও নিশ্চিত করেন যে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব এবং এ ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বরদাশত করা হবে না।
এই ধরনের ঘটনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত এবং এর জেরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় ক্যাম্পাসের পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। মো. রায়হানের ওপর হামলার ঘটনাটি আবারও এই প্রশ্ন সামনে এনেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা সক্ষম। একটি স্বাধীন ও নির্বিঘ্ন শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
