ফুটবল বিশ্বে বর্তমানে ফ্রান্স দলের পারফরম্যান্স এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, তাদের পরাজয়ের কথা কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তারা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে পুরো নব্বই মিনিটে একবারের জন্যও মনে হয়নি ফরাসিরা এই ম্যাচ হারতে পারে, এমনকি গোল হজম করার সম্ভাবনাও ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। শুধু এই ম্যাচই নয়, চলমান টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিপক্ষই ফ্রান্সের সামনে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বর্তমান ফুটবল বিশ্বে এই ফরাসি বাহিনীকে থামানোর মতো কোনো দল আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সকে চ্যালেঞ্জ জানাতে অতীতের কিংবদন্তি দলগুলোর কথা স্মরণ করছেন। কেউ বলছেন ২০০২ সালের সর্বজয়ী ব্রাজিল দল কিংবা ২০১০ সালের টিকিটাকা খেলা স্পেনের সোনালী প্রজন্মই কেবল পারত এই ফ্রান্সকে রুখে দিতে। দিদিয়ের দেশমের অধীনে এই ফরাসি দল যেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘পরম রূপ’ বা সেরাদের সেরা এক প্রতিচ্ছবি।
মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে শুরু থেকেই ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল ফ্রান্সের হাতে। রেফারির বাঁশি বাজার প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফরাসিরা দুবার গোলের জোরালো সুযোগ তৈরি করে। তবে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর অসাধারণ কিছু সেভের কারণে সে যাত্রায় বেঁচে যায় আফ্রিকান দলটি। ম্যাচের এই শুরুটাই বলে দিচ্ছিল পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে চলেছে। এরপর শুরু হয় ফ্রান্সের একের পর এক আক্রমণাত্মক ফুটবল। মধ্যমাঠ থেকে মাইকেল ওলিসে এবং আদ্রিয়াঁ রাবিওরা চমৎকারভাবে বলের জোগান দিচ্ছিলেন, আর আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে ও উসমান দেম্বেলেরা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ত্রাস সৃষ্টি করছিলেন।
ফরাসিদের মুহুর্মুহু আক্রমণের মুখে মরক্কোর রক্ষণভাগ এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল যে, তাদের প্রায় সব খেলোয়াড়কেই নিচে নেমে রক্ষণাত্মক বা ‘বাস পার্ক’ কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। এই প্রচণ্ড চাপ সামলাতে না পেরে বক্সের ভেতরে এমবাপ্পেকে ফাউল করে বসেন নুসাইর মাজরাউয়ি। তবে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন এমবাপ্পে, যা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম দুর্বল শট। পেনাল্টি মিস হলেও ফরাসি সমর্থকদের মধ্যে কোনো হতাশা বা সংশয় তৈরি হয়নি। কারণ মাঠের খেলাই বলে দিচ্ছিল, গোল হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রথমার্ধে মরক্কো কোনোমতে গোলশূন্য ব্যবধান ধরে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে তাদের সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। প্রথমার্ধে কিছুটা নিষ্ক্রিয় থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ম্যাচের ৬০ মিনিটে নিজের চেনা রূপে ফেরেন। ডি-বক্সের কাছাকাছি জায়গা থেকে দুর্দান্ত এক ট্রেডমার্ক শটে গোল করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি। এর ঠিক ছয় মিনিট পর, অর্থাৎ ৬৬ মিনিটে মরক্কোর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন উসমান দেম্বেলে। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কোর পক্ষে ম্যাচে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধানের জয়েই মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স।
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান মাত্র পাঁচ ধাপ থাকায় লড়াইটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠের পরিসংখ্যানে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। প্রথমার্ধে ফ্রান্স যেখানে গোলের উদ্দেশ্যে ১৩টি শট নিয়েছিল, সেখানে মরক্কো নিতে পেরেছিল মাত্র ১টি। ১৯৬৬ সালের পর থেকে নকআউট পর্বের ইতিহাসে এমন একপেশে আধিপত্যের ঘটনা কেবল একবারই ঘটেছিল—১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল ১৭টি শট নিয়েছিল।
এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্সকে এখনো পর্যন্ত কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়তে হয়নি, যা তাদের শক্তির গভীরতা প্রমাণ করে। ফরাসি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তারা একবার এগিয়ে গেলে প্রতিপক্ষের জন্য ম্যাচে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ সমতায় ফিরতে গিয়ে প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণাত্মক হয়, তখন ফ্রান্সের গতিময় ফরোয়ার্ডরা কাউন্টার অ্যাটাকে আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যদিও স্পেন, ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর ফ্রান্সকে চাপে ফেলার সামর্থ্য রয়েছে, তবে ফ্রান্সের বর্তমান স্কোয়াড ও বেঞ্চের গভীরতা বিবেচনা করলে তারাই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। ফুটবল ইতিহাসে যেকোনো মুহূর্তেই পাশা উল্টে যেতে পারে, তবে আপাতত ফরাসিদের এই বিজয় রথ থামানো যেকোনো দলের জন্যই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
