শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামের অদম্য মেধাবী কলি রানী। জন্মগতভাবেই দুই হাতের কবজি না থাকা সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। মানবিক বিভাগ থেকে কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কলি রানী যখন তার ডান পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম চেপে সাবলীলভাবে খাতায় উত্তর লিখছিলেন, তখন পরীক্ষার হলের অন্য শিক্ষার্থীরাও তার অদম্য সাহসের সাক্ষী হয়েছেন।
মৃত মনোরঞ্জন রায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট কলি রানীর জীবনের গল্পটি সংগ্রামের। ছোটবেলায় যখন তার সমবয়সীরা হাতে কলম তুলে নিয়ে বর্ণমালা শিখছিল, তখন কলি রানী শুরু করেন পায়ের সাহায্যে লেখার কঠিন লড়াই। পরিবারের অভাব-অনটন এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের গণ্ডি পেরিয়ে এসেছেন কৃতিত্বের সাথে। পঞ্চম শ্রেণিতে এ গ্রেড অর্জন থেকে শুরু করে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল—প্রতিটি ধাপেই তিনি তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। কলি কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নন; তিনি একজন দক্ষ সংগীতশিল্পী হিসেবেও বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন। প্রযুক্তির আধুনিক যুগে তিনি পা দিয়েই কম্পিউটার ও স্মার্টফোন ব্যবহারে সমান পারদর্শী।
পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় কলি রানীকে নিয়ম অনুযায়ী বাড়তি ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার এই আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। কলি রানীর বড় ভাই মন্টু রাম রায় জানান, ছোট থেকেই তার বোনের অদম্য জেদ ছিল পড়াশোনার প্রতি। সেই জেদ থেকেই তিনি পা দিয়ে লেখার কৌশল রপ্ত করেছেন। কলি রানী নিজের উচ্চাশার কথা জানিয়ে বলেন, তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হতে চান এবং ভবিষ্যতে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান।
এদিকে, কলি রানীর এই অসামান্য লড়াইয়ের প্রশংসা করেছেন কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা। তিনি জানান, প্রশাসন কলি রানীর এই অগ্রযাত্রায় পাশে থাকবে। তার উচ্চশিক্ষার পথ যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কলি রানীর জীবনের এই অধ্যায় কেবল একটি পরীক্ষার গল্প নয়, বরং এটি সেই সব মানুষের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যারা প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যেতে চায়। তার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবা করা, আর তার এই দৃঢ় সংকল্পই তাকে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
