হিউস্টনে ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে অপ্রত্যাশিতভাবে জাপানের কাছে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করেছে ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল। কাইশু সানোর এক দুর্দান্ত গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে গেছে ‘ব্লু সামুরাইরা’, যা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য এক বড় ধাক্কা। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে বলের দখল ব্রাজিলের পায়ে থাকলেও জাপানের সুসংগঠিত রক্ষণ এবং ক্ষিপ্র পাল্টা আক্রমণ সেলেসাওদের কৌশলকে অকার্যকর করে তুলেছে।
ম্যাচের ২৯তম মিনিটে জাপানের মিডফিল্ডার কাইশু সানো এক নান্দনিক গোল করে ব্রাজিল শিবিরকে স্তব্ধ করে দেন। এটি ছিল জাপানের জার্সি গায়ে সানোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। ব্রাজিলের নিজেদের অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সুযোগ নিয়ে সানো প্রায় অর্ধেক মাঠ পেরিয়ে এসে দূরপাল্লার এক জোরালো শট নেন। আলিসনের মতো বিশ্বসেরা গোলরক্ষকের পক্ষেও সেই বুলেট গতির শট ঠেকানো সম্ভব হয়নি, বল জালে আশ্রয় নেয়। এই গোলটি জাপানের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের খেলার ধরনে নতুন গতি এনে দেয়।
প্রথমার্ধে প্রায় ৮২ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেও ব্রাজিল জাপানের রক্ষণদেয়াল ভাঙতে ব্যর্থ হয়। মাতেউস কুনিয়ার একটি জোরালো শট জাপানি গোলরক্ষক জিওন সুজুকি অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন। ব্রুনো গিমারাইসের শট প্রতিহত হয় জাপানি ডিফেন্সে। এমনকি, লুকাস পাকেতার ফ্রি-কিকও সুজুকি প্রথমে ফসকালেও দ্রুতই তা নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ম্যাচের ১৫তম মিনিটে জাপানের বিপজ্জনক জায়গায় ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ব্রাজিলের মিডফিল্ডার কাসেমিরো, যা সেলেসাওদের ওপর চাপ আরও বাড়ায়। মাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারায় ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরনের হতাশা স্পষ্ট দেখা যায়।
অন্যদিকে, জাপান তাদের কৌশলগত খেলায় ছিল অটল। তারা রক্ষণভাগে দৃঢ়তা বজায় রেখে ব্রাজিলের আক্রমণ প্রতিহত করে এবং সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে উঠে আসে। কাইশু সানোর গোলটি ছিল তাদের এই কৌশলেরই ফসল। প্রথমার্ধের শেষভাগে এসে জাপান ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়, তাদের ছন্দময় ফুটবল ব্রাজিলকে আরও চাপে ফেলে দেয়। জাপানি কোচ হাজিমে মরিয়াসু, যিনি সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের একাদশ থেকে চারটি পরিবর্তন এনেছিলেন, তার এই সাহসী সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। ইনজুরির কারণে জাপানের মিডফিল্ডার তাকেফুসা কুবোর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দলের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই ম্যাচের আগে ব্রাজিলকে ফেভারিট ধরা হয়েছিল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এশিয়ান দেশগুলোর বিপক্ষে তাদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড ছিল। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর সঙ্গে ড্র করলেও হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অনায়াস জয় তুলে নিয়েছিল তারা। অন্যদিকে, জাপান গ্রুপ ‘এফ’ থেকে নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে এবং তিউনিসিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয়। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা সর্বশেষ আটটি বিশ্বকাপের প্রতিটিতেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল, কিন্তু ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২০ দলের বিপক্ষে নকআউট পর্বে তাদের সাম্প্রতিক রেকর্ড ছিল হতাশাজনক। জাপানের মতো একটি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ২০-এর দলের বিপক্ষে এই পিছিয়ে থাকা তাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিরতিতে গিয়ে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি নিশ্চয়ই নতুন করে কৌশল সাজানোর চেষ্টা করছেন। দ্বিতীয়ার্থে ঘুরে দাঁড়াতে হলে তাদের আক্রমণভাগে আরও ধার বাড়াতে হবে এবং জাপানের জমাট রক্ষণ ভাঙার পথ খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে, জাপান তাদের ঐতিহাসিক জয়ের সুযোগ ধরে রাখতে চাইবে। হিউস্টনের এই মাঠ থেকে কে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ম্যাচের শেষ বাঁশি পর্যন্ত। দ্বিতীয়র্ধের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের দিকে এখন তাকিয়ে আছে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
