কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপ পর্বের জমজমাট ৭২টি ম্যাচের পর্দা নেমেছে, শুরু হয়ে গেছে শেষ ৩২-এর শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই। এমন এক উত্তেজনাময় মুহূর্তে খেলাধুলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণকারী বিশ্বখ্যাত প্ল্যাটফর্ম অপ্টা অ্যানালিস্ট ঘোষণা করেছে এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সেরা একাদশ। পরিসংখ্যান ও পারফরম্যান্সের নিরিখে চোখধাঁধানো ফুটবল উপহার দেওয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এই দল ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, কারা জায়গা করে নিয়েছেন এই বিশেষ একাদশে।
গোলকিপার হিসেবে এই একাদশে জায়গা পেয়েছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়াস। স্পেনের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তার অনবদ্য পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। উরুগুয়ের বিপক্ষে দুটি গোল হজম করলেও গোলপোস্টের নিচে তার উপস্থিতি ছিল দলের জন্য ভরসার প্রতীক। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষেও তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। অপ্টার তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বে স্পেনের উনাই সিমন ছাড়া আর কোনো গোলকিপার ভোজিনিয়াসের চেয়ে বেশি ম্যাচে ক্লিন শিট রাখতে পারেননি, যা তার দক্ষতারই প্রমাণ।
রক্ষণভাগের দায়িত্বে রয়েছেন চার অপ্রতিরোধ্য তারকা। রাইটব্যাক হিসেবে ঘানার মারভিন সেনায়া তার অসাধারণ ট্যাকলিং ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন, যা তাকে গ্রুপ পর্বে ১৮টি সফল ট্যাকল এনে দিয়েছে, যা এই পজিশনে সর্বোচ্চ। ৩৮টি ডুয়েলের মধ্যে ২৪টিতেই জিতেছেন তিনি। ওয়ান-অন-ওয়ান ডিফেন্ডিংয়ে তার সাফল্যের হার ৭২ শতাংশ, যা একজন ডিফেন্ডারের কার্যকারিতার অন্যতম মাপকাঠি। সেন্টারব্যাক হিসেবে কেপ ভার্দের দিনেই বোর্হেস ৩১ বার বল ক্লিয়ার করে এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন। তিনি অন্তত ২০টি ডুয়েলে জড়িয়েছেন এমন ডিফেন্ডারদের মধ্যে ৬৮% সাফল্যের হার নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে। দলের বিপদ কাটানো এবং প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অসামান্য। ১৯ বছর বয়সী তরুণ সেন্টারব্যাক পাউ কুবারসি তার সহজাত দক্ষতা দিয়ে নজর কেড়েছেন, বিশেষ করে সঠিক সময়ে পজিশন নিয়ে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে। গ্রুপ পর্বে তার ১৬টি ‘পজেশন রিগেইন’ প্রশংসার দাবি রাখে। ২৯৪টি পাসের মধ্যে মাত্র ৫টি ভুল পাস দিয়েছেন এবং ৩৯টি লাইনব্রেকিং পাস দিয়ে তিনি তার পাসের নির্ভুলতা প্রমাণ করেছেন। লেফটব্যাক হিসেবে জাপানের কেইতো নাকামুরা গতি, ক্ষিপ্রতা এবং আক্রমণে ওঠার দক্ষতায় তার বাঁ প্রান্ত শাসন করেছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের প্রথম গোলটি এসেছে তার পা থেকে, তিউনিসিয়ার বিপক্ষেও প্রথম গোলের রূপকার ছিলেন তিনিই। ৭টি ড্রিবলিংয়ের মধ্যে ৫টি সফলভাবে শেষ করেছেন এবং ৯ বার আক্রমণে সরাসরি যুক্ত থেকে নিজের আক্রমণাত্মক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন।
মাঝমাঠের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টন ম্যাকেনি এবং ইকুয়েডরের পেদ্রো ভিতে। ম্যাকেনি তার আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ধার বাড়িয়েছেন। ষাঁড়ের মতো ক্ষিপ্রগতিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে তার সহজাত ড্রিবলিং যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ওপেন প্লেতে তৈরি করা ৭টি গোলের সুযোগ তাকে মিডফিল্ডারদের মধ্যে শীর্ষ সারিতে রেখেছে। অন্যদিকে, ইকুয়েডরের পেদ্রো ভিতে বল পায়ে সাবলীল, পাসিংয়ে সৃজনশীল এবং বলের দখল হারানোর পর তা পুনরুদ্ধারে অক্লান্ত পরিশ্রমী। ওপেন প্লে থেকে সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে তার চেয়ে এগিয়ে মাত্র চারজন খেলোয়াড় (৮টি)। ১৪টি ট্যাকল করে তিনি তৃতীয় স্থানে আছেন এবং প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অন্যতম সেরা (২৩টি)। ২৩৪টি পাস দিয়ে তিনি পাসের নির্ভুলতাও প্রমাণ করেছেন।
আক্রমণভাগে রয়েছেন বিশ্বকাপের চার মহাতারকা—লিওনেল মেসি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্লিং হালান্ড এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে। রাইট উইংয়ে লিওনেল মেসিকে এবারের বিশ্বকাপের সেরা পারফর্মার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার বিরল রেকর্ড গড়েছেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই তার গোল সংখ্যা ৬টি। লেফট উইংয়ে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করে তার ভয়ংকর রূপ প্রদর্শন করেছেন। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের সব ম্যাচে তার গোল করাকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে, কারণ এর আগে যে তিন আসরে ব্রাজিল গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল পেয়েছে, প্রতিবারই তারা শিরোপা ঘরে তুলেছে। স্ট্রাইকার হিসেবে নরওয়ের আর্লিং হালান্ড মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই ৪ গোল করেছেন, যা মেসির পরেই সর্বোচ্চ। পেনাল্টি ছাড়া তার ২.৬৮ ‘এক্সপেক্টেড গোল’ (এক্সজি) রেটিংও এবারের বিশ্বকাপে ভিনিসিয়ুসের (৩.৫১) পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কমপক্ষে ৫টি শট নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে ৪০ শতাংশ শট গোলে রূপান্তর করে হালান্ড আছেন যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে। ফরাসি স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপ্পে চলতি বিশ্বকাপে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য। বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা অন্তত তিন ম্যাচে দুই বা এর বেশি গোল করা চতুর্থ খেলোয়াড় তিনি। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের তালিকায় ১৬ গোল নিয়ে ফরাসি তারকা মেসির ঠিক পেছনেই আছেন। গ্রুপ পর্বে নিজের সেরাটা মেলে ধরে তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চই যেন তার জন্য শ্রেষ্ঠ জায়গা।
এই তারকাখচিত একাদশ প্রমাণ করে, এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই খেলোয়াড়রা তাদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন। এই পারফর্মারদের নৈপুণ্য নকআউট পর্বেও অব্যাহত থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
