মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখার অঙ্গীকার করেছেন, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্য ছিল। বিশেষ করে, তেহরানের নৌবাহিনী এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার অভিযোগ আনছে।
এই উত্তেজনা বৃদ্ধির মূলে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরী সম্পর্ক। বিশেষত, ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি পুনরায় আরোপের পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে বরাবরই হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। অন্যদিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই প্রণালীকে ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখার ঘোষণা ইরানের জন্য একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। ইরান অতীতে বহুবার হুমকি দিয়েছে যে, যদি তাদের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তারা এই প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ‘নৌ অবরোধ’ আরোপের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
এই সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসাবে ‘সি ড্রোন’ বা সমুদ্র ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। এই অত্যাধুনিক মানববিহীন নৌযানগুলো পারস্য উপসাগরের মতো সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথে নজরদারি এবং সম্ভাব্য সামরিক অপারেশনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং ইরানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ধারাবাহিক সামরিক পদক্ষেপ এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তেলের দামের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, অন্যথায় এটি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়নি, তবে ছোট আকারের হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনাগুলো একটি বিপজ্জনক প্রবণতা নির্দেশ করছে। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তি ও নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভর করছে উভয় পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
