Tuesday , July 14 2026
Breaking News
হরমুজ প্রণালিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চরমে: ঝুঁকিতে সমঝোতা স্মারক, বাড়ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চরমে: ঝুঁকিতে সমঝোতা স্মারক, বাড়ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ঘোষণার ফলে গত মাসে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সোমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে ‘ফি’ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন। তেহরান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলোকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তেহরানও এই স্মারকের শর্ত মেনে চলবে না।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যা ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। এই চুক্তির পর থেকে প্রায় দুই মাস ধরে সংঘাত অনেকটাই প্রশমিত ছিল। তবে গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী তিনটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর গত রোববার থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে থেমে থেমে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, যদিও ওয়াশিংটন দাবি করেছে যে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখনও চালু আছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার সক্ষমতা কমাতেই রোববার রাতে ও সোমবার দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং নৌযান লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। এসব হামলায় ইরানে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত, বাহরাইন, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইনে একটি মার্কিন ড্রোনবহর ধ্বংস করা হয়েছে এবং ওমানে রাডার ব্যবস্থা ও জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা চলমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে দেখছেন। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন এবং ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর নতুন করে আলোচনার কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পল মুসগ্রেভ আল-জাজিরাকে বলেছেন, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাত। যখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি ক্ষীণ আশা দেখা যাচ্ছিল, তখন সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দেন যে, যদি ইরান সমঝোতা স্মারক থেকে সরে যায়, তাহলে সংঘাত আরও বাড়তে পারে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিকে তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরান চায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম দফায় বলা হয়েছিল যে, ইরান হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করবে এবং এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও ওমান আলোচনা করবে।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা এই সমঝোতার লঙ্ঘন বলে ইরান মনে করছে। ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবার অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে এবং হরমুজ দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফি’ দিতে হবে। এর আগে তিনি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রই এই জলপথের অভিভাবক হবে। এতে যে ব্যয় হবে, তার জন্য আমাদের অর্থ পাওয়া উচিত। হরমুজ পাহারা দেওয়ার জন্য আমরা অর্থ নিতে যাচ্ছি।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, স্মারকের প্রথম দফায় হামলা বন্ধের কথা বলা হলেও, গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় তা এরই মধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে। এছাড়া, ১০ নম্বর দফায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলা হলেও, ওয়াশিংটন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক মেনে চলবে না। প্রতিবারই যখন অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন আমরাও আমাদের প্রতিশ্রুতি পালন করিনি। ভবিষ্যতেও আমরা একইভাবে কাজ করে যাব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ খোলা হবে না।’ এই পরিস্থিতিতে তেলের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং গতকাল ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সুইজারল্যান্ড ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দফা আলোচনা হলেও, পরবর্তী ধাপের আলোচনা কবে হবে তা এখনো অনিশ্চিত। যদিও ট্রাম্প বলেছিলেন তেহরানের অনুরোধে তিনি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনায় রাজি হয়েছেন, ইরান এমন কোনো আবেদন করার কথা অস্বীকার করেছে। তবে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় রাজি হয়েছে। এর আগে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে মাসকাটে আলোচনা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে তা বিফলে গেছে বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি মনে করেন, সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো পক্ষই বাস্তবতা নিজেদের অনুকূলে নিতে পারবে না। উভয় পক্ষকেই বুঝতে হবে যে, সমস্যা সমাধানের জন্য সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই, এবং আশা করা যায় তারা আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবে।

এছাড়াও

হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ: ইরান-মার্কিন উত্তেজনা নতুন মোড়

হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ: ইরান-মার্কিন উত্তেজনা নতুন মোড়

মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন অবরোধ কার্যকর করতে যাচ্ছে, যা মঙ্গলবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *