সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত ঘোষণা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে তিনি হরমোজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত কার্গোর উপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের এবং ইরানের উপর বন্দর অবরোধ পুনর্বহালের কথা বলেছিলেন। এই ধরনের পদক্ষেপ যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাতেও গভীর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হরমোজ প্রণালী বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালীর মধ্য দিয়েই পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। তাই, এই জলপথের উপর যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা শুল্ক আরোপ বিশ্ববাজারে তেলের দামকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেছিল, যার ফলস্বরূপ তেহরানের অর্থনীতির উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং ইরানের তেল রপ্তানির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণা, যেখানে হরমোজ প্রণালীর উপর শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে, তা সেই ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিরই একটি সম্প্রসারিত রূপ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ২০ শতাংশ শুল্কের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তেল এবং অন্যান্য পণ্যের পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। শিপিং কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হবে এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের একটি পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমোজ প্রণালীর মতো আন্তর্জাতিক জলপথগুলোতে অবাধ নৌচলাচলের অধিকার স্বীকৃত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ বা অবরোধের চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এটি অন্যান্য দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ইরান, যারা এই প্রণালীর এক পাশে অবস্থিত, তারা এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে দেখতে পারে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যার ফলে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, এমন পদক্ষেপের ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান বৈশ্বিক শক্তিগুলো, যারা এই প্রণালীর মাধ্যমে বাণিজ্য করে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অস্থিরতা আনতে পারে। পরিশেষে, হরমোজ প্রণালীর উপর যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা শুল্ক আরোপের ঘোষণা কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক চাল, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
