মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন অবরোধ কার্যকর করতে যাচ্ছে, যা মঙ্গলবার বিকাল ৪টা থেকে শুরু হওয়ার কথা। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ইরানের তেল রপ্তানিকে আরও কঠিন করে তোলা এবং দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন, যা ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতিরই অংশ। এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই প্রণালী দিয়েই সম্পন্ন হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং কাতারের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই পথ ব্যবহার করে। তাই এই প্রণালীতে যেকোনো ধরনের অবরোধ বা প্রতিবন্ধকতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর, বিশেষ করে তেলের বাজারে, তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন অবরোধ আরোপের প্রেক্ষাপটে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর থেকে তিনি ইরানের ওপর একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছেন। ওয়াশিংটনের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং দেশটির ‘অস্থিতিশীল’ আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য অপরিহার্য। তবে ইরান বরাবরই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার দাবি করে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব এবং সামরিক অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিপিং কোম্পানিগুলোও উচ্চতর ঝুঁকি এবং বীমা প্রিমিয়ামের মুখোমুখি হবে, যা পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু একই সাথে এটি তেহরানকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করতে পারে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই প্রস্তাব নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগী এই ধরনের পদক্ষেপের কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের মতো একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ইঙ্গিত দেয় যে, প্রশাসনের মধ্যে ইরানের প্রতি কঠোর নীতির প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।
অতীতেও ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে, বিশেষ করে যখন তাদের তেল রপ্তানি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তবে পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে এবং ভুল বোঝাবুঝি বা ছোটখাটো ঘটনাও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো যায় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। এই নতুন অবরোধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কী পরিবর্তন আনে, তা এখন দেখার বিষয়।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
