মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সমন (আইনি নোটিশ) জারির ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতির সরকারি বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগের খবর প্রকাশের জের ধরে সাংবাদিকদের ওপর এই আইনি চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই পদক্ষেপকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নিউইয়র্ক টাইমসের কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক মার্কিন বিমান বাহিনীর নতুন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ প্রকল্পের নকশা, এর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এই প্রকল্পের বিপুল ব্যয় সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হাতে পান। পরবর্তীতে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনটিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিমানের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা বেশ কিছু বড় ধরনের ত্রুটি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছিল। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং এই তথ্যের গোপন উৎস বা ‘সোর্স’ কে, তা উদ্ঘাটন করতে সাংবাদিকদের আইনি নোটিশ পাঠায়।
এই সমন জারির ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস কর্তৃপক্ষ। সংবাদমাধ্যমটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার একটি নগ্ন প্রচেষ্টা। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে এবং তথ্যের উৎসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কোনোভাবেই তাদের সোর্সের নাম প্রকাশ করবেন না। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (First Amendment) সংবাদপত্রের যে স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ তার সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলে হোয়াইট হাউসের সাথে মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর সম্পর্ক ছিল চরম বৈরিতাপূর্ণ। ট্রাম্প প্রায়শই সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোকে ‘ভুয়া খবর’ (Fake News) ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ সময়ে এসে সাংবাদিকদের এভাবে নিশানা করা এবং সরকারি তথ্য ফাঁসের (leaks) তদন্তের নামে তাদের ওপর আইনি খড়্গহস্ত হওয়া সেই বৈরি মনোভাবেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন সাংবাদিক অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠন, যেমন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (CPJ) এবং ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (RSF) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, সাংবাদিকদের যদি তাদের গোপন সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়, তবে ভবিষ্যতে কেউ আর ক্ষমতার অপব্যবহার বা সরকারি ত্রুটি নিয়ে মুখ খুলতে সাহস পাবে না। এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেবে, যা একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করার এই প্রবণতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বব্যাপী মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য একটি অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক টাইমস আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক আইনি লড়াইয়ের ফলাফল ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষার পরিধি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
