হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ধারাবাহিক হামলা বন্ধের জন্য একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার আদায়ের লক্ষ্যে ওমানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হচ্ছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি দল অংশ নেবে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সিনেটর জে. ডি. ভ্যান্সও রয়েছেন। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। এই প্রণালীটি এতটাই সংকীর্ণ যে এটিকে ‘চোকপয়েন্ট’ বা কৌশলগত জলপথ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই জলপথের নিরাপত্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী এবং কখনও কখনও সরাসরি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, জাহাজ আটক করেছে বা হয়রানি করেছে। এসব ঘটনা বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা বারবার এই ধরনের কার্যকলাপের নিন্দা জানিয়েছে এবং ইরানকে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালীতে নির্বিঘ্ন নৌচলাচল নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইরানের দিক থেকে, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো প্রায়শই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। তেহরান দাবি করে যে তাদের কার্যকলাপ তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অধিকারের অংশ।
ওমান, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। পূর্বেও বিভিন্ন সংবেদনশীল বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের আয়োজন করেছে দেশটি। এই আলোচনার আয়োজন ওমানের কূটনৈতিক নৈপুণ্যের আরও একটি প্রমাণ। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ওমান বরাবরই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। এবারের বৈঠকে মূল লক্ষ্য হলো ইরানের কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি আদায় করা, যাতে তারা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে।
সিনেটর জে. ডি. ভ্যান্সের মতো উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তার উপস্থিতি এই আলোচনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যদিও তিনি প্রশাসনের নির্বাহী শাখার অংশ নন, একজন সিনেটরের অংশগ্রহণ কংগ্রেসের সমর্থন এবং দ্বিদলীয় ঐকমত্যের ইঙ্গিত দেয়। এটি ইরানের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে যে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের কাছেও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এই ধরনের আলোচনা প্রায়শই বিস্তৃত পরিসরের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে পরমাণু চুক্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস কমানোর প্রচেষ্টা অন্যতম।
হরমুজ প্রণালীতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। যদি ইরান জাহাজ হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস এবং বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতের কারণে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা দেখার জন্য আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ইতিবাচক কূটনৈতিক আবহ তৈরি হতে পারে। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বজায় থাকলে তা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, যা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
